বস্তাপ্রতি বাড়তি ১ হাজার টাকা, সারের কৃত্রিম সংকটে কৃষকের পকেট ফাঁকা
দেশে সারের সংকট নেই বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও আমনের ভরা মৌসুমে মাঠের চিত্র ভিন্ন। রাজবাড়ী, যশোরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।
সরবরাহ সংকটের অজুহাতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডিলার ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। এতে বাড়ছে কৃষকের উৎপাদন খরচ, তৈরি হচ্ছে লোকসানের আশঙ্কা।
সরকারের হিসাবে, চলতি জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশে সারের চাহিদা ১৩ লাখ ২১ হাজার টন। এর বিপরীতে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার সরবরাহ করা হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় ৪৪ হাজার টন বেশি। সরকারের দাবি, দেশে পর্যাপ্ত মজুতও রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকেরা বলছেন, বরাদ্দ ও সরবরাহ ব্যবস্থার গলদ এবং কৃত্রিম সংকটের কারণে তাঁরা ন্যায্যমূল্যে প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে বাজারে সার সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই আতঙ্কে অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় আগেই সার কিনে রাখছেন। ফলে বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক এএসএম সাইফুল ইসলাম বলেন, নীতিমালায় পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে সামনে সারের সংকট হতে পারে—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। আতঙ্কে কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সারের চেয়ে বেশি পরিমাণ এখনই কিনে রাখার চেষ্টা করছেন। এতে বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও আশঙ্কা করেন, সাব-ডিলার প্রথা বাতিল হলে মুষ্টিমেয় ডিলারের হাতে সারের বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে। এতে কৃষকের পরিবহন ব্যয় ও ভোগান্তি দুটিই বাড়বে।
রাজবাড়ীতে চাহিদার অর্ধেক টিএসপি বরাদ্দ
রাজবাড়ীতে সারের সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতির চিত্র পাওয়া গেছে। চলতি মৌসুমে জেলায় টিএসপি সারের চাহিদা ৬ হাজার ১১ টন হলেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ১ টন। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় অর্ধেক সার বরাদ্দ পেয়েছে জেলা।
ডিএপি ও ইউরিয়া সারের ক্ষেত্রেও চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম বলে জানা গেছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা অন্য জেলা থেকে সার এনে পরিবহন ব্যয়ের অজুহাতে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, পরিচিত দোকান ছাড়া অনেক জায়গায় সার পাওয়া যাচ্ছে না। ৫০ কেজির এক বস্তা সারের জন্য সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
পাংশার কৃষক অমল মন্ডল অভিযোগ করেন, ইউরিয়া সারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও ১ হাজার ৮০০ টাকার নিচে তা পাওয়া যাচ্ছে না। একইভাবে টিএসপি সারের ৫০ কেজির বস্তাও বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।
যশোরে গুদামে সার, তবু বাজারে সংকট
যশোরে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, বাফার গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও ডিলাররা সংকটের কথা বলছেন। প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি প্রায় ১ হাজার টাকা বেশি দামে সার বিক্রির তথ্যও পাওয়া গেছে।
জরিমানা করা হলেও কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
যশোরের চৌগাছার কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, সার পাওয়া যাচ্ছে না। দুই বস্তা চাইলে একটি বস্তা দেওয়া হচ্ছে। এরপরও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাম দিতে হচ্ছে।
তবে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা সার সংকটের কথা স্বীকার করছেন না। রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম রসুল বলেন, জেলায় সারের সংকট নেই। কৃষকেরা জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় কখনো কখনো সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তরিকুল ইসলামও দাবি করেন, জেলায় সারের সংকট নেই। তাঁর অভিযোগ, ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।
গ্যাস সংকটে কমেছে দেশীয় উৎপাদন
দেশের সার বাজারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো গ্যাস সংকট। কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি কারখানার মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৩৭ লাখ টনের বেশি হলেও গ্যাস সংকটের কারণে গত অর্থবছরে এসব কারখানায় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৬ হাজার টন। অর্থাৎ সক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ উৎপাদন হয়েছে।
ফলে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৮৪ শতাংশ সার আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর দেশের সার বাজারের নির্ভরতা বাড়ছে।
ভরা মৌসুমে নতুন নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন
সারের সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের মধ্যে সরকার ‘সার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন নীতিমালায় সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা প্রথা পুরোপুরি বাতিলের কথা বলা হয়েছে।
সরকারের উদ্দেশ্য কৃষকের কাছে সঠিক দামে সার পৌঁছানো এবং ডিলারদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমানো হলেও, ভরা মৌসুমে দীর্ঘদিনের সরবরাহব্যবস্থা পরিবর্তনের সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকেরা।
তাঁদের মতে, বছরের পর বছর চলে আসা সরবরাহ ব্যবস্থা হঠাৎ করে পরিবর্তন করলে মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নতুন নীতিমালায় অসন্তুষ্ট ডিলারদের একাংশ সার উত্তোলন ও বিতরণে ধীরগতি দেখাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রাজবাড়ী সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল হক বাদশা বলেন, তাঁর বরাদ্দের ৫০ শতাংশ রেখে বাকি সার নয়জন সাব-ডিলারের মধ্যে ভাগ করে দিতে হয়।
তবে রাজবাড়ী সদরের আলীপুর ইউনিয়নের এক সাব-ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগস্টে মূল ডিলারের কাছ থেকে পাওয়া সার মাসের প্রথম ১০ দিনেই শেষ হয়ে গেছে। এরপর চাহিদা কম এমন জেলা থেকে সার এনে বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্য জেলার ডিলারকে বাড়তি দাম দিতে হওয়ায় তাঁদেরও বেশি দামে সার বিক্রি করতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
সরকারের নতুন উদ্যোগ
সার নিয়ে কৃষক ও ডিলারদের উদ্বেগ কাটাতে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। সার ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ২৬ আগস্ট বগুড়ায় সাংবাদিকদের জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বর্তমান ডিলাররাই সার উত্তোলন ও বিক্রি করবেন। কাউকে বাতিল করা হচ্ছে না।
এ ছাড়া সার মজুত সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখতে সরকার ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার কেনার অনুমোদন দিয়েছে। এর আগে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ডিলারদের কাছে বিভিন্ন ধরনের ৭ লাখ ৯৯ হাজার টন সার সরবরাহ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের জন্য আরও ৪ লাখ ৪২ হাজার টনের বেশি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী দেশে সারের মজুত ও সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও কৃষকেরা যদি মাঠপর্যায়ে ন্যায্যমূল্যে সার না পান, তাহলে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি আমন ও পরবর্তী মৌসুমের ফসল উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই কাগজে-কলমে সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডিলার পর্যায়ে সারের প্রকৃত বিতরণ, বরাদ্দের বৈষম্য এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ কঠোরভাবে নজরদারির দাবি উঠেছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: