পটুয়াখালীর খামারে কোটি টাকার সাপের বিষ, বাজারজাতের সুযোগ না থাকায় অপার সম্ভাবনা থমকে
একসময় বিষধর সাপ মানেই ছিল আতঙ্ক। অথচ সেই সাপের বিষ বা ভেনমই বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। প্রাণঘাতী সাপের কামড়ের প্রতিষেধক অ্যান্টিভেনম তৈরির প্রধান কাঁচামাল এই ভেনমের জন্য বাংলাদেশকে এখনও বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। অথচ পটুয়াখালীর একটি নিবন্ধিত সাপের খামারে নিয়মিত ভেনম সংগ্রহ করা হলেও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও বাজারজাতের সুযোগ না থাকায় সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগটি কার্যত থমকে আছে।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস প্রায় ২৬ বছর ধরে বিষধর সাপ সংরক্ষণ, উদ্ধার, প্রজনন এবং ভেনম সংগ্রহের কাজ করে আসছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’ খামারটি সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পেয়েছে। তবে নিবন্ধন মিললেও উৎপাদিত ভেনম বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার বা বাজারজাত করার সুযোগ এখনও তৈরি হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উদ্যোক্তার নিজ বাড়ির সামনেই গড়ে উঠেছে খামারটি। বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে পৃথক খাঁচায় সংরক্ষণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ। প্রতিটি খাঁচায় সংশ্লিষ্ট সাপের নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ রয়েছে এবং কর্মীরা নিয়মিত সাপগুলোর পরিচর্যা করছেন।
খামারটিতে বর্তমানে কিং কোবরা, সাদা গোখরা, পদ্ম গোখরা, কেউটে, রাসেলস ভাইপার, পাইথন, পঙ্খীরাজ, দাঁড়াশ, বাসুয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় আড়াই শতাধিক সাপ রয়েছে। এখান থেকে নিয়মিত ভেনম সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও তা এখনও শিল্পখাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়নি।

উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস জানান, প্রবাস জীবন শেষে ২০০০ সালে শখের বসে সাপ পালন শুরু করেন তিনি। পরে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বা আহত সাপ উদ্ধার করে সংরক্ষণ এবং সচেতনতা তৈরির কাজও শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেই উদ্যোগই একটি নিবন্ধিত সাপের খামারে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ২৬ বছরে খামারটি গড়ে তুলতে নিজের প্রবাস জীবনের সঞ্চয়, জমি বিক্রির অর্থ এমনকি স্ত্রীর গহনাও বিক্রি করতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। নিবন্ধন পেলেও সরকারিভাবে আর্থিক কিংবা কারিগরি সহযোগিতা না পাওয়ায় খামার পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মীদের বেতন ও সাপের পরিচর্যার ব্যয় বহন করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
খামারের কর্মী হৃদয় বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত বেতন পাওয়া যায় না। তবুও ভালোবাসা থেকেই তারা খামারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় সাপ উদ্ধার করে যে সামান্য পারিশ্রমিক পাওয়া যায়, সেটিই অনেক সময় আয়ের একমাত্র উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় বাসিন্দা খলিলুর রহমানের মতে, দেশের জন্য মূল্যবান এই উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, রাজ্জাক বিশ্বাস ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করে দেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় খাত গড়ে তুলেছেন।
আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস দাবি করেন, তাদের খামার থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড ভেনম সংগ্রহ করা সম্ভব, যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় আট কোটি টাকা। তবে কাঁচা ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যায় না। এটি নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত করে ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করতে হয়। নিবন্ধন পাওয়ার তিন মাস পার হলেও দেশের কোনো ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত এই ভেনম সংগ্রহ বা ব্যবহার নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি।
তিনি আরও বলেন, দেশীয় ভেনম ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন শুরু হলে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন অনেকাংশে কমে যাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। তিনি সরকার ও দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রতি এ খাতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মো. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, স্থানীয়ভাবে ভেনম সংগ্রহের সুযোগ থাকলেও অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের জন্য উন্নত গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষায়িত অবকাঠামো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ জরুরি। খামার কর্তৃপক্ষ আবেদন করলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের জন্য নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত ও অনুমোদনের পরই ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।
অন্যদিকে, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত ভেনমের মাধ্যমে অ্যান্টিভেনমের কাঁচামাল নিশ্চিত করা গেলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সাপে কাটা রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তবে এ ধরনের খামার পরিচালনায় সর্বোচ্চ জৈব নিরাপত্তা, প্রাণিকল্যাণ নীতি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সরকারি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওষুধ শিল্পের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ খাত দেশের চিকিৎসা ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: