৮২২ কোটি টাকার সড়কে কাদা-গর্ত, দুর্ভোগে সাতক্ষীরার মানুষ
সংস্কারের নামে মাসের পর মাস খুঁড়ে রাখা হয়েছে সড়ক। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও হাঁটুসমান কাদা-পানি। সামান্য বৃষ্টি হলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে গর্তে আটকে যাচ্ছে যানবাহন, ঘটছে দুর্ঘটনাও। ৮২২ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চললেও সাতক্ষীরা–ভেটখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ অংশে কমছে না জনদুর্ভোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতি ও নির্মাণকাজের অব্যবস্থাপনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের উন্নয়নকাজ এগোচ্ছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন রোগী, শিক্ষার্থী, নিত্যযাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকেরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে উন্নয়নকাজের জন্য রাস্তা কেটে রাখা হয়েছে। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে এসব স্থানে জমেছে কাদা-পানি। পিচ্ছিল সড়কে যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। কোথাও কোথাও যানবাহন কাদায় আটকে যাওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
বাসচালক আব্দুর রউফ বলেন, এই সড়কে গাড়ি চালানো এখন জীবন বাজি রাখার মতো। প্রতিদিন কোনো না কোনো যানবাহন কাদায় আটকে যাচ্ছে কিংবা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। গাড়ি মেরামতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন শ্রমিকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
শ্যামনগরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, সড়কের বর্তমান অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। সড়কের প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে রোগীর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংস্কারের নামে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘদিন এভাবে দুর্ভোগে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
৮২২ কোটি টাকার প্রকল্প, অগ্রগতি মাত্র ৩২ শতাংশ
সাতক্ষীরা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা থেকে ভেটখালী পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কটির দৈর্ঘ্য ৬২ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটির বিভিন্ন অংশ খানাখন্দে ভরে যায়। পরে সড়কটির উন্নয়ন ও নির্মাণকাজের জন্য ৮২২ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকল্পটির কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
৬২ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ পাঁচটি প্যাকেজে ভাগ করে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। তবে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩১ থেকে ৩২ শতাংশ।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থানান্তরের জটিলতায় ২ ও ৩ নম্বর প্যাকেজের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া নির্মাণকাজের বিভিন্ন পর্যায়ে সময়ক্ষেপণের কারণেও প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে হয়নি।
নির্মাণকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমডি মাঈনুদ্দীন লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক রবিউল ইসলাম বলেন, নির্মাণসামগ্রী আনার সময় তার উৎস অনুমোদিত থাকে। পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই ব্যবহার করা হয়। তাই অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু নির্মাণসামগ্রীর মান নিশ্চিত করলেই হবে না, নির্মাণকাজের গতি ও সড়ক ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দিতে হবে। নির্মাণকাজ চলার সময় পর্যাপ্ত বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাতক্ষীরা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার পারভেজ বলেন, বিভিন্ন জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজে সময় নষ্ট হয়েছে। তবে ১১ মাসে প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ।
তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক খুঁটির কারণে ২ ও ৩ নম্বর প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা শেষ করা সম্ভব হয়নি। আশা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। নির্মাণকাজ নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। জনদুর্ভোগ কমাতে এখনই ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত ভরাট, কাদাপানি অপসারণ, যান চলাচলের জন্য অস্থায়ী ব্যবস্থা এবং নির্মাণকাজের গতি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সাতক্ষীরা–ভেটখালী সড়ক, ৮২২ কোটি টাকার সড়ক প্রকল্প, সাতক্ষীরা সড়ক দুর্ভোগ, শ্যামনগর কালিগঞ্জ সড়ক, সড়ক নির্মাণকাজ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: