বিচারক জীবনের নেপথ্যের মানসিক যন্ত্রণার কথা শোনালেন ম্যাজিস্ট্রেট মিতু
‘যে খবর পড়ে মানুষ ঘুমাতে পারে না, আমাদের তা রোজ দেখতে হয়’
পত্রিকায় কোনো নৃশংস খুনের খবর পড়ে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো শিশুর ওপর হওয়া পাশবিক নির্যাতনের বর্ণনা শুনে সাধারণ মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। গা গুলিয়ে ওঠে অনেকের। কিন্তু যে ঘটনাগুলো কেবল পড়ে বা শুনেই সাধারণ মানুষ শিউরে ওঠে, একজন বিচারককে প্রতিদিন সেই বীভৎস ঘটনাগুলোরই চাক্ষুষ প্রমাণ দেখতে হয়, শুনতে হয় ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ।
বিচারকের আসনে বসে দিনের পর দিন এই চরম মানসিক ট্রমা সামলানোর নেপথ্যের গল্প এবার সামনে এনেছেন টাঙ্গাইল জেলার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোসা: জান্নাতুন নাইম মিতু।
সম্প্রতি নিজের এক লেখায় বিচারক জীবনের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রূঢ় বাস্তবতা, মানসিক যন্ত্রণার তীব্রতা এবং সমাজের দ্বিমুখী নীতি নিয়ে মুখ খুলেছেন তিনি।
মানসিক স্বাস্থ্যের চরম ঝুঁকি ও একাকিত্ব
বিচারকদের প্রতিদিনের কাজের ধরন কতটা ভয়াবহ মানসিক চাপ তৈরি করে, তা বোঝাতে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট মিতু লেখেন, "অনেকে বলতে শুনি, 'ওই মার্ডার কেইসটার নিউজ পড়ে গা গুলিয়ে যাচ্ছে', 'বাচ্চাটার সাথে যা হয়েছে শুনে তিন রাত ঘুমাতে পারি নি'। জ্বী, আপনি যা সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখে-শুনে-পড়ে খেতে পারেন না, ঘুমাতে পারেন না আমরা সেগুলো রোজ সামনা-সামনি দেখি, তাদের কথা শুনি, আমাদের কাজ সেগুলো দেখে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।"
নিজের চেয়েও প্রবীণ বিচারকদের কথা ভেবে তিনি আতঙ্কিত হন জানিয়ে বলেন, "আমি মাঝেমধ্যে আমাদের জেলা জজ পদমর্যাদার স্যারদের কথা ভেবে আতঙ্কিত হই। এই মানুষগুলো দিনের পর দিন মার্ডার, রেইপ, ব্রুটাল কিলিং-সহ এরকম মামলাগুলোতে সাক্ষ্যগ্রহণ করছেন।"
ভয়ংকর সব অপরাধের বিচার করতে গিয়ে বিচারকদের মানসিক স্বাস্থ্যের যে ব্যাপক ক্ষতি হয়, তার কোনো প্রতিকার নেই জানিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "আমাদের সবার মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। উপরন্তু, আমাদের বাইরে সাধারণ মানুষের সাথে মেশার সুযোগ সীমিত।"
'জজ-সাহেবদের ভুল করতে নেই'
মানসিক এই চাপের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাপ্রসূত সমালোচনা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। তিনি তার প্রথম জেলা জজ শ্রদ্ধেয় আবু শামীম আজাদ স্যারের একটি কথা স্মরণ করে লেখেন, "জজ-সাহেবরা খানিকটা ইমামদের মত। তাদের ভুল করতে নেই।"
বঙ্গদেশে সবার ভুল করার সুযোগ থাকলেও ডাক্তার এবং বিচারকদের তা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। আইন না জেনেও সাধারণ মানুষের ‘বিচার কেন হচ্ছে না’, ‘অজ্ঞ বিচারক’ ইত্যাদি মন্তব্য এবং কিছু মানুষের ছলে-বলে-কৌশলে বিচারকগোষ্ঠীকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করার মানসিকতার সমালোচনা করেন তিনি।
আত্মীয়দের অন্যায় আবদার ও সমাজের ভণ্ডামি
চাকরিতে যোগদানের পর আত্মীয়স্বজনের চাপ কীভাবে বাড়ে, সে বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেন। অন্যায় আবদার না শুনলে বিচারকদের ‘বেয়াদব’ বা ‘অহংকারী’ তকমা দেওয়া হয়। সমাজের দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করে তিনি জানান, এদেশের বেশিরভাগ মানুষ সরকারি চাকরিজীবীদের দুর্নীতিবাজ বলে গালি দিতে পছন্দ করেন। অথচ কোনো সৎ কর্মকর্তা যদি অবৈধ উপায়ে ঢাকায় ফ্ল্যাট বা গাড়ি কিনতে না পারেন, তবে সেই মানুষগুলোই তাকে কথা শোনাতে ছাড়েন না।
ক্ষমতা নয়, পুরোটাই দায়িত্ব
বাইরে থেকে বিচারকদের অনেক ক্ষমতাশালী মনে হলেও, এই পেশার অন্তর্নিহিত সত্যটি তুলে ধরে ম্যাজিস্ট্রেট মিতু তার লেখার শেষে জানান, "এই তিন বছরে একটা বিষয় শিখেছি, ক্ষমতা বলতে আসলে কিছু নেই, যেটা আছে সেটা দায়িত্ব। মানুষ দায়িত্বের অপব্যবহার করাকে ক্ষমতা হিসেবে চিনে।"
একজন বিচারকের প্রতিদিনের মানসিক সংগ্রাম ও সামাজিক প্রতিকূলতার এই বাস্তব চিত্রটি ইতোমধ্যে সচেতন পাঠকদের ভাবিয়ে তুলেছে। সমাজের উচিত বিচারকদের এই নীরব আত্মত্যাগ ও মানসিক লড়াইয়ের প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল হওয়া।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: