কালীগঞ্জে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে বাবলুর ‘ভয়ংকর’ অপরাধ জগত: অতিষ্ঠ এলাকাবাসী
দখল, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো—এসব গুরুতর অভিযোগের লম্বা তালিকা গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব খালেকুজ্জামান বাবলু ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে কালীগঞ্জে তিনি গড়ে তুলেছেন বিশাল এক অপরাধ সাম্রাজ্য ও প্রভাববলয়।
দীর্ঘদিন নীরব থাকলেও সম্প্রতি তার ও তার ভাইদের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা। বিচার ও নিরাপত্তার দাবিতে তারা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনও করেছেন।
দখল, চাঁদাবাজি ও অন্যের গাড়িতে বিলাসী জীবন:
কালীগঞ্জে অপরাধ জগতের অন্ধকার দিকের আলোচনা উঠলেই সাধারণ মানুষের মুখে বারবার উঠে আসে খালেকুজ্জামান বাবলুর নাম। কৃষিজমি ও সরকারি খাসজমি অবৈধভাবে বালু দিয়ে ভরাট করে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং চাঁদাবাজির মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ। তার বিলাসবহুল বাড়ি ও জীবনযাপন নিয়ে জনমনে রয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশটি হলো—বাবলু বর্তমানে যে কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়িতে চলাফেরা করেন, সেটিও নাকি তার নিজের নয়। স্থানীয়দের দাবি, গাড়িটি যুবলীগ নেতা মাহবুবুল হাসান রনির কাছ থেকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব হওয়ায় নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে প্রশাসন, থানা ও সাধারণ মানুষকে চাপে রাখার অভিযোগ রয়েছে বাবলুর বিরুদ্ধে। কেউ তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে শারীরিক নির্যাতন, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো এবং জেল খাটানোর হুমকি।
ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ ও মানববন্ধন:
দিনের পর দিন চলে আসা এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবশেষে ফুঁসে উঠেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। গত ২৯ আগস্ট দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাবলু ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মানববন্ধনে দুবাইপ্রবাসী আলমগীর কবিরের ভাই ইকবাল আহমেদ অভিযোগ করেন, বাবলু সিন্ডিকেট গায়ের জোরে তাদের প্রায় চার বিঘা জমি দখল করেছে। এছাড়া মাদক কারবারের প্রতিবাদ করায় বায়েজিদ হাসান শিবলী নামের এক যুবককে মারধরের অভিযোগ তোলেন তার ভাই মো. মুজাহিদুল ইসলাম। ভুক্তভোগীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাবলু ও তার বাহিনীর ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পেতেন না কেউ। এখন তারা এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
অপরাধের জালে দুই ভাইও:
শুধু বাবলু একাই নন, অভিযোগের আঙুল তার দুই ভাই আনিসুর রহমান রিপন ও সোহেলের দিকেও। বড় ভাই বাবলুর ইশারায় ছোট ভাই রিপন এলাকায় মাদকের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। মাদকের গডফাদার এবং গাজীপুরের অপরাধ জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে বাবলু ও তার ভাইদের নিয়মিত ওঠাবসা রয়েছে। জমি দখল থেকে শুরু করে অবৈধ বালু ভরাট—সবখানেই এই তিন ভাইয়ের ত্রাসের রাজত্ব।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন আঁতাত?
বাবলুর বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো রাজনৈতিক ভোল পাল্টানোর কৌশল। স্থানীয়দের দাবি, দিনের বেলায় বিএনপির বড় নেতা হলেও রাতের আঁধারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গোপনে দেখা করেন এবং বিভিন্ন স্থানে একসঙ্গে সময় কাটান তিনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমনই হোক, নিজের প্রভাব ও অপরাধ সাম্রাজ্য অটুট রাখতেই সব পক্ষের সঙ্গে এই গোপন যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন বাবলু।
বিএনপির পাল্টা দাবি:
তবে বাবলু ও স্থানীয় বিএনপি নেতারা এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। সম্প্রতি কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির মাস্টার ও সদস্যসচিব খালেকুজ্জামান বাবলু এক যৌথ প্রতিবাদলিপিতে দাবি করেন, প্রেসক্লাবের সামনের মানববন্ধনটি ছিল সাজানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ভাড়াটে লোক দিয়ে বাবলুর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে কোটি টাকার এই মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে—রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কি সত্যিই কালীগঞ্জে তৈরি হয়েছে কোনো শক্তিশালী অপরাধী বলয়? জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক, ভয়ভীতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক গোপন যোগাযোগ—এক ব্যক্তিকে ঘিরে এত অভিযোগের উৎস কোথায়?
এমন আরও গুরুতর তথ্য জানতে চোখ রাখুন ৩য় পর্বে........

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: