infoamaderdin@gmail.com বৃহঃস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

শাস্তির বদলে পদোন্নতি পাওয়া গণপূর্তের সেই প্রকৌশলীকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০২৬ ১৩:০৭ পিএম

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন শাখা) মুহাম্মদ সারোয়ার জাহানকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, বদলি বাণিজ্য, নিয়োগে কারসাজি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গুরুতর অভিযোগে বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হওয়ার পরও শাস্তির পরিবর্তে পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

একই সঙ্গে সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে গণবদলি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ টাকার সিকিউরিটি মানির পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়ন করেন সারোয়ার জাহান। ঠিকাদারের অভিযোগের পর ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হলেও পরে রহস্যজনকভাবে তিনি অব্যাহতি পান। পরবর্তীতে পদোন্নতি দিয়ে তাকে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এদিকে সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা একটি ভিডিওতে সারোয়ার জাহানের অফিস কক্ষে টেবিলের ওপর বিপুল পরিমাণ টাকা দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে তিনি দাবি করেন, এটি ৬৬৯ জনের নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার রিক্রুটমেন্ট ব্যয় বাবদ অফিসের টাকা। গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীও বিষয়টি জুন মাসের হিসাবনিকাশের অর্থ বলে উল্লেখ করেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব পাওয়ার পর গত ৩ মার্চ একদিনেই ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলীকে বদলির আদেশ জারি করেন সারোয়ার জাহান। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে এ বদলি করা হয় এবং পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন হয়েছে। পরে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে ওই বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন ছাড়া বদলি ও পদোন্নতির কোনো ফাইল অগ্রসর না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৪ থেকে ২০ গ্রেডের ৬৬৯টি পদে নিয়োগ কার্যক্রমে ৫৪১ জন যোগদান করলেও বাকি ১২৮টি শূন্য পদের জন্য অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে নিয়োগের উদ্দেশ্যে গত ২১ মে ওয়েবসাইটে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই তালিকা ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।

অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা প্রার্থীদের অভিযোগ, মেধাতালিকায় থাকা প্রার্থীদের বাদ দিয়ে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নতুন প্রার্থী অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তাদের দাবি, তালিকা প্রকাশের পর অনেকেই বর্তমান চাকরি ছেড়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তালিকা সরিয়ে দেওয়ায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

এদিকে গত ৯ জুন আরও ১৭৮টি শূন্য পদে নতুন নিয়োগের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ফলে আগের নিয়োগের অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা ১২৮ জন প্রার্থীর ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চেয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠানো হয়।

সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের কিছু বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনেও মামলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তার জারি করা একাধিক বদলি আদেশ স্থগিত করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে সারোয়ার জাহান বলেন, তার টেবিলে থাকা অর্থ অফিসের রিক্রুটমেন্ট ব্যয়ের টাকা। বদলির বিষয়ে তিনি দাবি করেন, অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী বদলি করা হয়েছিল এবং পরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তা স্থগিত করা হয়েছে। ওয়েবসাইট থেকে অপেক্ষমাণ তালিকা সরিয়ে ফেলার বিষয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই তালিকাটি প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

তবে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ টাকার জামানতের পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়নের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, "এজন্য আমি ক্ষমা চাইছি।"

এ ঘটনায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন মহল।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


শাস্তির বদলে পদোন্নতি পাওয়া গণপূর্তের সেই প্রকৌশলীকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০২৬ ১৩:০৭ পিএম

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন শাখা) মুহাম্মদ সারোয়ার জাহানকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, বদলি বাণিজ্য, নিয়োগে কারসাজি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গুরুতর অভিযোগে বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হওয়ার পরও শাস্তির পরিবর্তে পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

একই সঙ্গে সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে গণবদলি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ টাকার সিকিউরিটি মানির পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়ন করেন সারোয়ার জাহান। ঠিকাদারের অভিযোগের পর ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হলেও পরে রহস্যজনকভাবে তিনি অব্যাহতি পান। পরবর্তীতে পদোন্নতি দিয়ে তাকে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এদিকে সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা একটি ভিডিওতে সারোয়ার জাহানের অফিস কক্ষে টেবিলের ওপর বিপুল পরিমাণ টাকা দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে তিনি দাবি করেন, এটি ৬৬৯ জনের নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার রিক্রুটমেন্ট ব্যয় বাবদ অফিসের টাকা। গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীও বিষয়টি জুন মাসের হিসাবনিকাশের অর্থ বলে উল্লেখ করেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব পাওয়ার পর গত ৩ মার্চ একদিনেই ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলীকে বদলির আদেশ জারি করেন সারোয়ার জাহান। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে এ বদলি করা হয় এবং পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন হয়েছে। পরে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে ওই বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন ছাড়া বদলি ও পদোন্নতির কোনো ফাইল অগ্রসর না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৪ থেকে ২০ গ্রেডের ৬৬৯টি পদে নিয়োগ কার্যক্রমে ৫৪১ জন যোগদান করলেও বাকি ১২৮টি শূন্য পদের জন্য অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে নিয়োগের উদ্দেশ্যে গত ২১ মে ওয়েবসাইটে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই তালিকা ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।

অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা প্রার্থীদের অভিযোগ, মেধাতালিকায় থাকা প্রার্থীদের বাদ দিয়ে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নতুন প্রার্থী অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তাদের দাবি, তালিকা প্রকাশের পর অনেকেই বর্তমান চাকরি ছেড়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তালিকা সরিয়ে দেওয়ায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

এদিকে গত ৯ জুন আরও ১৭৮টি শূন্য পদে নতুন নিয়োগের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ফলে আগের নিয়োগের অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা ১২৮ জন প্রার্থীর ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চেয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠানো হয়।

সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের কিছু বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনেও মামলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তার জারি করা একাধিক বদলি আদেশ স্থগিত করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে সারোয়ার জাহান বলেন, তার টেবিলে থাকা অর্থ অফিসের রিক্রুটমেন্ট ব্যয়ের টাকা। বদলির বিষয়ে তিনি দাবি করেন, অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী বদলি করা হয়েছিল এবং পরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তা স্থগিত করা হয়েছে। ওয়েবসাইট থেকে অপেক্ষমাণ তালিকা সরিয়ে ফেলার বিষয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই তালিকাটি প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

তবে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ টাকার জামানতের পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়নের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, "এজন্য আমি ক্ষমা চাইছি।"

এ ঘটনায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন মহল।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর