infoamaderdin@gmail.com বৃহঃস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

সাইনবোর্ডে ভিক্ষুকমুক্ত নড়াইল, পুনর্বাসন হারিয়ে ফিরছেন অনেকে ভিক্ষাবৃত্তিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০২৬ ২১:০৭ পিএম

যশোর-অভয়নগর সীমান্ত পেরিয়ে নড়াইল জেলায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে একটি বড় সাইনবোর্ড—‘স্বাগতম, ভিক্ষুকমুক্ত নড়াইল জেলা’। তবে সরকারি এই ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। জেলা শহরের বিভিন্ন সড়ক, বাস টার্মিনাল, রূপগঞ্জ বাজার এবং সরকারি দপ্তরের সামনে এখনো নিয়মিত দেখা যায় অসহায় মানুষকে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে।

জানা যায়, ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নড়াইলের ৩৯টি ইউনিয়নের প্রায় ৮০০ ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়। তাদের গরু, ছাগল, সেলাই মেশিন, ভ্যান, ছোট দোকানসহ বিভিন্ন আয়ের উপকরণ দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন।

তবে কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা অনেকটাই থেমে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সীমিত সরকারি সহায়তা এবং আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড টিকিয়ে রাখতে না পারায় পুনর্বাসিতদের অনেকেই আবার ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে গেছেন।

রূপগঞ্জ বাজারে দেখা মেলে হুইলচেয়ার কিংবা লাঠিতে ভর দিয়ে চলা বহু মানুষের। তাদের অনেকেই জানান, সরকারি ভাতা ও সহায়তা দিয়ে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সংসার চালানো সম্ভব নয়। মির্জাপুর গ্রামের প্রবীণ শাজাহান ও কলোড়া গ্রামের সুখরানির মতো অনেকেই বলেন, সংসারের খরচ, চিকিৎসা ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সামাল দিতে না পেরে বাধ্য হয়েই আবার রাস্তায় নামতে হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পুনর্বাসনের সময় দেওয়া সহায়তা ছিল এককালীন এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অভাবের তাড়নায় কেউ কেউ সেই সম্পদ বিক্রি করে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হয়েছেন।

নড়াইলে ভিক্ষাবৃত্তি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসার আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে আসা ভিক্ষুকদের উপস্থিতি। যশোরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন কিংবা হাটের দিনে অনেকে নড়াইলে এসে ভিক্ষা করেন এবং দিন শেষে নিজ এলাকায় ফিরে যান।

যশোর থেকে আসা প্রতিবন্ধী আব্দুস সালাম বলেন, নিজের এলাকায় পরিচিত মানুষের কাছে হাত পাততে সংকোচ লাগে। নড়াইলের মানুষ সহানুভূতিশীল হওয়ায় তিনি নিয়মিত এখানে এসে ভিক্ষা করেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বিশেষ করে হাটের দিনগুলোতে বাইরের জেলার মানুষের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। এতে বাজার এলাকায় ভিক্ষুকের উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ে।

সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা উত্তম সরকার বলেন, ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে বাইরের জেলা থেকে মানুষ আসায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের পুনর্বাসন টেকসই করতে তারা কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কেবল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বা এককালীন সহায়তা দিয়ে কোনো জেলাকে দীর্ঘমেয়াদে ভিক্ষুকমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান, নিয়মিত তদারকি, পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং পুনর্বাসনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের উদ্যোগ স্থায়ী সুফল বয়ে আনে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ভিক্ষাবৃত্তি কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; বরং চরম দারিদ্র্য, অসুস্থতা, বেকারত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন। তাই নড়াইলকে সত্যিকার অর্থে ভিক্ষুকমুক্ত করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টেকসই পুনর্বাসন এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


সাইনবোর্ডে ভিক্ষুকমুক্ত নড়াইল, পুনর্বাসন হারিয়ে ফিরছেন অনেকে ভিক্ষাবৃত্তিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০২৬ ২১:০৭ পিএম

যশোর-অভয়নগর সীমান্ত পেরিয়ে নড়াইল জেলায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে একটি বড় সাইনবোর্ড—‘স্বাগতম, ভিক্ষুকমুক্ত নড়াইল জেলা’। তবে সরকারি এই ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। জেলা শহরের বিভিন্ন সড়ক, বাস টার্মিনাল, রূপগঞ্জ বাজার এবং সরকারি দপ্তরের সামনে এখনো নিয়মিত দেখা যায় অসহায় মানুষকে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে।

জানা যায়, ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নড়াইলের ৩৯টি ইউনিয়নের প্রায় ৮০০ ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়। তাদের গরু, ছাগল, সেলাই মেশিন, ভ্যান, ছোট দোকানসহ বিভিন্ন আয়ের উপকরণ দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন।

তবে কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা অনেকটাই থেমে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সীমিত সরকারি সহায়তা এবং আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড টিকিয়ে রাখতে না পারায় পুনর্বাসিতদের অনেকেই আবার ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে গেছেন।

রূপগঞ্জ বাজারে দেখা মেলে হুইলচেয়ার কিংবা লাঠিতে ভর দিয়ে চলা বহু মানুষের। তাদের অনেকেই জানান, সরকারি ভাতা ও সহায়তা দিয়ে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সংসার চালানো সম্ভব নয়। মির্জাপুর গ্রামের প্রবীণ শাজাহান ও কলোড়া গ্রামের সুখরানির মতো অনেকেই বলেন, সংসারের খরচ, চিকিৎসা ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সামাল দিতে না পেরে বাধ্য হয়েই আবার রাস্তায় নামতে হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পুনর্বাসনের সময় দেওয়া সহায়তা ছিল এককালীন এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অভাবের তাড়নায় কেউ কেউ সেই সম্পদ বিক্রি করে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হয়েছেন।

নড়াইলে ভিক্ষাবৃত্তি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসার আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে আসা ভিক্ষুকদের উপস্থিতি। যশোরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন কিংবা হাটের দিনে অনেকে নড়াইলে এসে ভিক্ষা করেন এবং দিন শেষে নিজ এলাকায় ফিরে যান।

যশোর থেকে আসা প্রতিবন্ধী আব্দুস সালাম বলেন, নিজের এলাকায় পরিচিত মানুষের কাছে হাত পাততে সংকোচ লাগে। নড়াইলের মানুষ সহানুভূতিশীল হওয়ায় তিনি নিয়মিত এখানে এসে ভিক্ষা করেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বিশেষ করে হাটের দিনগুলোতে বাইরের জেলার মানুষের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। এতে বাজার এলাকায় ভিক্ষুকের উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ে।

সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা উত্তম সরকার বলেন, ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে বাইরের জেলা থেকে মানুষ আসায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের পুনর্বাসন টেকসই করতে তারা কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কেবল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বা এককালীন সহায়তা দিয়ে কোনো জেলাকে দীর্ঘমেয়াদে ভিক্ষুকমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান, নিয়মিত তদারকি, পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং পুনর্বাসনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের উদ্যোগ স্থায়ী সুফল বয়ে আনে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ভিক্ষাবৃত্তি কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; বরং চরম দারিদ্র্য, অসুস্থতা, বেকারত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন। তাই নড়াইলকে সত্যিকার অর্থে ভিক্ষুকমুক্ত করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টেকসই পুনর্বাসন এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর