infoamaderdin@gmail.com মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
৩ ভাদ্র ১৪৩৩

বন্ধ হচ্ছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি, আচরণবিধি তৈরির নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৮ আগষ্ট ২০২৬ ১৪:০৮ পিএম

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দলীয় রাজনীতি, ঠিকাদারি, জমি কেনাবেচায় দালালি, সালিশ-দরবার, বাজার ও অটোরিকশা সমিতি নিয়ন্ত্রণসহ শিক্ষার বাইরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা বন্ধ করতে এ আচরণবিধি তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চাকরিতে বহাল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পর এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আচরণবিধির খসড়া তৈরির কাজ চলছে এবং শিগগিরই তা চূড়ান্ত করা হতে পারে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আচরণবিধি করা হবে। এতে একজন শিক্ষক কী করতে পারবেন এবং কী করতে পারবেন না, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। শিক্ষকতার বাইরে অন্য কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা বন্ধের বিষয়টি এতে গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না হওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। নতুন আচরণবিধিতে তাদের পেশাগত দায়িত্ব, আচরণ এবং শিক্ষার বাইরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান থাকবে। চাকরিতে বহাল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে।

গত ২৮ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু অনেক শিক্ষক রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাবহির্ভূত নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে নতুন আচরণবিধি প্রণয়ন এবং প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে তাদের সম্পৃক্ততা বন্ধে কঠোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় ওই বৈঠকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আচরণবিধি প্রণয়নের নির্দেশনা আসে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য পৃথক কোনো আচরণবিধি রয়েছে কি না। কর্মকর্তারা জানান, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে মূলত এমপিও নীতিমালার বিধান অনুসরণ করা হয়। ওই নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট বা শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়—এমন দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষকদের বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা সৃষ্টি করাকেও অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে উল্লেখ রয়েছে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। ফলে নির্দিষ্ট আচরণবিধির অভাবে অনেক শিক্ষক দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পাশাপাশি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ সালিশ-দরবার, ঠিকাদারি, জমি কেনাবেচায় দালালি, বাজার বা অটোরিকশা সমিতি নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হচ্ছেন।

শিক্ষকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি তৈরির উদ্যোগ অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ও শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরি নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান না থাকায় অনেক শিক্ষক রাজনৈতিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

তবে বর্তমান উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, শিক্ষকদের নির্বাচনের মাঠ থেকে দূরে রাখার কৌশল হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জামায়াতপন্থী শিক্ষক নেতারাও এর বিরোধিতা করেছেন। তাদের দাবি, স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতের অনেক প্রার্থী শিক্ষক হওয়ায় এই উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ইউনেসকো ও আইএলও দিয়েছে। এ সুযোগ কেড়ে নেওয়া সংবিধানের সমতা ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সরকার কেন শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ করতে চায়, তা শিক্ষকরা বুঝে গেছেন। প্রয়োজনে শিক্ষকদের নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এর পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, শিক্ষকরা যখন জনপ্রতিনিধি হন, তখন তুলনামূলকভাবে কম দুর্নীতিতে জড়ান। তাই শিক্ষকদের জনপ্রতিনিধি হওয়া ঠেকানো যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়।

চাকরিতে বহাল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনেরও উদ্যোগ রয়েছে। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, শিক্ষকরা যাতে চাকরি বহাল রেখে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে জন্য স্থানীয় সরকার আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর পেছনে বিরোধী দলের শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকানোর কোনো উদ্দেশ্য নেই বলেও তিনি জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মনে করেন, শিক্ষকদের নির্দিষ্ট নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলার মধ্যে থাকা স্বাভাবিক বিষয়। তার মতে, শিক্ষকদের রাজনীতিতে প্রবেশের কারণে শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই সবাইকে নির্দিষ্ট আচরণবিধির আওতায় আনা উচিত। তবে এ নীতি যেন শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা খর্ব করার হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

কেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে লাভজনক পদে থাকা ব্যক্তিদের সংসদ বা স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরাসরি সরকারি কর্মচারী নন। তারা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং নিয়োগ ও চাকরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকেন। সরকার তাদের বেতন-ভাতার বড় অংশ বহন করলেও সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর প্রযোজ্য নির্বাচনী বিধিনিষেধ সরাসরি তাদের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি। ফলে অনেক শিক্ষক চাকরিতে থেকেই স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

আগের উদ্যোগও থেমে গিয়েছিল

২০১৮ সালের উদ্যোগেও শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছিল। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অনেক শিক্ষক রাজনৈতিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন। এতে পাঠদান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এ ছাড়া বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন বা নিয়মিত পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ব্যবস্থা না থাকায় তাদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নও কঠিন হয়ে পড়ে বলে ওই সময়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী শিক্ষক নেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকেও অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না বলে অভিযোগ ছিল।

এবার নতুন আচরণবিধি হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি শিক্ষার বাইরে তাদের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট সীমারেখা তৈরি হবে। এর ফলে দলীয় রাজনীতি, ঠিকাদারি ও বিভিন্ন স্থানীয় কর্মকাণ্ডে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা কতটা কমে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা কতটা ফিরে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


বন্ধ হচ্ছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি, আচরণবিধি তৈরির নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ আগষ্ট ২০২৬ ১৪:০৮ পিএম

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দলীয় রাজনীতি, ঠিকাদারি, জমি কেনাবেচায় দালালি, সালিশ-দরবার, বাজার ও অটোরিকশা সমিতি নিয়ন্ত্রণসহ শিক্ষার বাইরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা বন্ধ করতে এ আচরণবিধি তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চাকরিতে বহাল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পর এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আচরণবিধির খসড়া তৈরির কাজ চলছে এবং শিগগিরই তা চূড়ান্ত করা হতে পারে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আচরণবিধি করা হবে। এতে একজন শিক্ষক কী করতে পারবেন এবং কী করতে পারবেন না, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। শিক্ষকতার বাইরে অন্য কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা বন্ধের বিষয়টি এতে গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না হওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। নতুন আচরণবিধিতে তাদের পেশাগত দায়িত্ব, আচরণ এবং শিক্ষার বাইরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান থাকবে। চাকরিতে বহাল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে।

গত ২৮ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু অনেক শিক্ষক রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাবহির্ভূত নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে নতুন আচরণবিধি প্রণয়ন এবং প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে তাদের সম্পৃক্ততা বন্ধে কঠোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় ওই বৈঠকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আচরণবিধি প্রণয়নের নির্দেশনা আসে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য পৃথক কোনো আচরণবিধি রয়েছে কি না। কর্মকর্তারা জানান, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে মূলত এমপিও নীতিমালার বিধান অনুসরণ করা হয়। ওই নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট বা শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়—এমন দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষকদের বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা সৃষ্টি করাকেও অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে উল্লেখ রয়েছে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। ফলে নির্দিষ্ট আচরণবিধির অভাবে অনেক শিক্ষক দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পাশাপাশি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ সালিশ-দরবার, ঠিকাদারি, জমি কেনাবেচায় দালালি, বাজার বা অটোরিকশা সমিতি নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হচ্ছেন।

শিক্ষকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি তৈরির উদ্যোগ অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ও শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরি নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান না থাকায় অনেক শিক্ষক রাজনৈতিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

তবে বর্তমান উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, শিক্ষকদের নির্বাচনের মাঠ থেকে দূরে রাখার কৌশল হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জামায়াতপন্থী শিক্ষক নেতারাও এর বিরোধিতা করেছেন। তাদের দাবি, স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতের অনেক প্রার্থী শিক্ষক হওয়ায় এই উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ইউনেসকো ও আইএলও দিয়েছে। এ সুযোগ কেড়ে নেওয়া সংবিধানের সমতা ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সরকার কেন শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ করতে চায়, তা শিক্ষকরা বুঝে গেছেন। প্রয়োজনে শিক্ষকদের নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এর পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, শিক্ষকরা যখন জনপ্রতিনিধি হন, তখন তুলনামূলকভাবে কম দুর্নীতিতে জড়ান। তাই শিক্ষকদের জনপ্রতিনিধি হওয়া ঠেকানো যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়।

চাকরিতে বহাল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনেরও উদ্যোগ রয়েছে। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, শিক্ষকরা যাতে চাকরি বহাল রেখে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে জন্য স্থানীয় সরকার আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর পেছনে বিরোধী দলের শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকানোর কোনো উদ্দেশ্য নেই বলেও তিনি জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মনে করেন, শিক্ষকদের নির্দিষ্ট নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলার মধ্যে থাকা স্বাভাবিক বিষয়। তার মতে, শিক্ষকদের রাজনীতিতে প্রবেশের কারণে শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই সবাইকে নির্দিষ্ট আচরণবিধির আওতায় আনা উচিত। তবে এ নীতি যেন শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা খর্ব করার হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

কেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে লাভজনক পদে থাকা ব্যক্তিদের সংসদ বা স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরাসরি সরকারি কর্মচারী নন। তারা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং নিয়োগ ও চাকরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকেন। সরকার তাদের বেতন-ভাতার বড় অংশ বহন করলেও সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর প্রযোজ্য নির্বাচনী বিধিনিষেধ সরাসরি তাদের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি। ফলে অনেক শিক্ষক চাকরিতে থেকেই স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

আগের উদ্যোগও থেমে গিয়েছিল

২০১৮ সালের উদ্যোগেও শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছিল। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অনেক শিক্ষক রাজনৈতিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন। এতে পাঠদান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এ ছাড়া বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন বা নিয়মিত পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ব্যবস্থা না থাকায় তাদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নও কঠিন হয়ে পড়ে বলে ওই সময়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী শিক্ষক নেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকেও অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না বলে অভিযোগ ছিল।

এবার নতুন আচরণবিধি হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি শিক্ষার বাইরে তাদের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট সীমারেখা তৈরি হবে। এর ফলে দলীয় রাজনীতি, ঠিকাদারি ও বিভিন্ন স্থানীয় কর্মকাণ্ডে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা কতটা কমে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা কতটা ফিরে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর