সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপির ‘ভিডিও ভাইরাল’
সিসি ফুটেজ ২০২৩ সালের, এখন বলছেন দ্বিতীয় স্ত্রী, ওঠেনি হলফনা
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামের এক তরুণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জেলায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার পরপরই দলীয় মিডিয়া সেল থেকে ভিডিওটি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি দাবি করা হলেও, তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘বেঙ্গল লেন্স’ ভিডিওটিকে আসল বলে চিহ্নিত করেছে।
অন্যদিকে, ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে ২০২৩ সালের ১ জুলাইয়ের সময় দেখতে পাওয়া গেলেও, সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের দাবি—চলতি বছরের ১৭ জুন পারিবারিকভাবে ও প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে তাদের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে, জামায়াতের জেলা নেতৃত্ব ও এমপি নিজেই ভিডিওটির নারীকে ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ বলে দাবি করলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনী হলফনামায় এই বিয়ের কোনো উল্লেখ ছিল না, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) নিজস্ব ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এমপি গাজী নজরুল ভিডিওটির নারী তাঁর ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ বলে নিশ্চিত করে এটিকে ব্ল্যাকমেইলিং এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন।
গত সোমবার (২০ জুলাই) রাতে সিসিটিভি ফুটেজ ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একাধিক ভিডিওচিত্র ফেসবুকসহ নানা প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এমপি গাজী নজরুলকে এক তরুণীর সঙ্গে একটি কক্ষে অবস্থান করতে এবং ফোনে কথা বলার পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মিডিয়া সেল পরিচালিত ‘ক্রাইম বার্তা’ দাবি করে, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি একটি ভুয়া ও বিকৃত ভিডিও।
তবে তথ্য যাচাইকারী স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ‘বেঙ্গল লেন্স’ তাদের অনুসন্ধানে জানায়, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি এআই বা এডিটেড নয়, এটি সম্পূর্ণ আসল। প্রতিষ্ঠানটির অনুসন্ধানে সিসিটিভি ফুটেজের সময় উল্লেখ করা হয়েছে ২০২৩ সালের ১ জুলাই। তবে ফুটেজটি কোথায় ধারণ করা হয়েছে, সে স্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, ভিডিওটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি উনার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় স্ত্রীর বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে হলেও তার পরিবার বর্তমানে ঢাকায় থাকে।
বিয়ে কবে হয়েছে জানতে চাইলে এই নেতা নির্দিষ্ট তারিখ বলতে না পেরে জানান, বিয়েটি নির্বাচনপরবর্তী সময়ে ‘বেশ কিছুদিন আগে’ সম্পন্ন হয়েছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজ ২০২৩ সালের হলে এবং বিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে হলে এত আগের ভিডিও কীভাবে এলো-সেই বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, সিসি ক্যামেরা কেন ছিল এবং ভিডিও বাইরে কেন এল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ২০২৩ সালের ভিডিওর বিষয়টি টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞ দিয়ে খতিয়ে দেখতে হবে।
এদিকে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে জমা দেওয়া গাজী নজরুলের নির্বাচনী হলফনামায় দ্বিতীয় স্ত্রীর বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ ছিল না, যা নিয়ে নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার পর একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি। তবে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক প্রোফাইল থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে গাজী নজরুল দাবি করেন, গত ১৭ জুন, ২০২৬ তারিখে পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে দ্বিতীয় স্ত্রী মোছাঃ মরিয়াম বেগমের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। গত ১৩ জুলাই ঢাকার মগবাজারে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসায়িক অফিসে প্রথমা ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে আমরা যাই। সেখানে অবস্থানকালে যোহরের নামাজের আগে আমার গাড়িচালক ও দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে গিয়ে ৫-৭ জন অপরিচিত লোককে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে এবং আমাদের জিম্মি করে ১ লাখ টাকা আদায় করে।
এমপি আরও অভিযোগ করেন, ভাড়াকৃত গাড়ি আটকে রেখে পরবর্তীতে কয়েক লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয় মুহূর্তের ভিডিও চিত্র ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি একে পারিবারিক বিরোধের জের এবং সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: