infoamaderdin@gmail.com বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

‎গঙ্গাচড়ায় তিস্তার গ্রাসে ৮ বসতবাড়ি, শত বিঘা কৃষিজমি

‘আজ রাতে কী খাব জানি না’

মেহেদি হাসান প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০২৬ ২১:০৭ পিএম

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের কাচাড়িপাড়া এলাকায় তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। গত কয়েক দিনের অব্যাহত ভাঙনে অন্তত আটটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

একই সঙ্গে শত বিঘা আবাদি জমি তিস্তার গর্ভে হারিয়ে গেছে। পানি কমতে শুরু করলেও ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী শতাধিক পরিবার।

মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তার তীব্র স্রোতে মুহূর্তেই নদীতীর ধসে পড়ছে। অনেক পরিবারের বাড়ির আঙিনা ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে, আবার কোথাও ভাঙন এসে পৌঁছেছে বসতঘরের একেবারে কাছে। শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় কেউ ঘরের টিন, কাঠ ও ইট খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন, আবার অনেকে গৃহস্থালির সামান্য মালামাল নিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মোত্তালিব হোসেন, সুরুজ ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, আবু তালেবসহ অন্তত আটটি পরিবারের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি শত বিঘা ফসলি জমি ভাঙনের কবলে পড়েছে। আরও বহু বাড়িঘর ও কৃষিজমি এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মোত্তালেব হোসেনের স্ত্রী মর্জিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আল্লাহ ছাড়া এখন আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। আজ রাতে কী খাব, সেটাও জানি না। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে। বহু কষ্টে গড়ে তোলা সংসার মুহূর্তেই নদীতে চলে গেছে।”

মোত্তালেব হোসেন বলেন, ২০০৮ সালে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত তার পাকা বাড়িটি মুহূর্তেই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সরকারের কাছে দ্রুত সহায়তা ও ভাঙনরোধে জিও ব্যাগ বা কংক্রিট ব্লক ফেলার দাবি জানান তিনি।

একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সুরুজ ইসলাম বলেন, নদীতে বাড়ি হারিয়ে এখন ভাঙা ইট-পাথর সংগ্রহ করে অন্য কোথাও মাথা গোঁজার চেষ্টা করছেন। আর আবু তালেব জানান, গত ৩৫ বছরে চার থেকে পাঁচবার বাড়ির স্থান পরিবর্তন করলেও এবার শেষ সম্বলটুকুও তিস্তা কেড়ে নিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, দ্রুত কার্যকর ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কয়েকশ বসতবাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইতোমধ্যে কয়েকটি বসতবাড়ি ও বিপুল কৃষিজমি নদীতে চলে গেছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ভাঙনের খবর পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে নদীতীর রক্ষার কাজ চলমান রয়েছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৫১ দশমিক ৯৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও নদীর তীব্র স্রোতে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে তিস্তা অববাহিকার ভাঙন পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিস্তার ভাঙনের প্রভাবে রংপুরের গঙ্গাচড়া ছাড়াও লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী, কুড়িগ্রামের চিলমারী, রাজারহাট, উলিপুর, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ এবং নীলফামারীর জলঢাকাসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে পানি ঢুকে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


‎গঙ্গাচড়ায় তিস্তার গ্রাসে ৮ বসতবাড়ি, শত বিঘা কৃষিজমি

‘আজ রাতে কী খাব জানি না’

মেহেদি হাসান

প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০২৬ ২১:০৭ পিএম

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের কাচাড়িপাড়া এলাকায় তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। গত কয়েক দিনের অব্যাহত ভাঙনে অন্তত আটটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

একই সঙ্গে শত বিঘা আবাদি জমি তিস্তার গর্ভে হারিয়ে গেছে। পানি কমতে শুরু করলেও ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী শতাধিক পরিবার।

মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তার তীব্র স্রোতে মুহূর্তেই নদীতীর ধসে পড়ছে। অনেক পরিবারের বাড়ির আঙিনা ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে, আবার কোথাও ভাঙন এসে পৌঁছেছে বসতঘরের একেবারে কাছে। শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় কেউ ঘরের টিন, কাঠ ও ইট খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন, আবার অনেকে গৃহস্থালির সামান্য মালামাল নিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মোত্তালিব হোসেন, সুরুজ ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, আবু তালেবসহ অন্তত আটটি পরিবারের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি শত বিঘা ফসলি জমি ভাঙনের কবলে পড়েছে। আরও বহু বাড়িঘর ও কৃষিজমি এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মোত্তালেব হোসেনের স্ত্রী মর্জিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আল্লাহ ছাড়া এখন আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। আজ রাতে কী খাব, সেটাও জানি না। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে। বহু কষ্টে গড়ে তোলা সংসার মুহূর্তেই নদীতে চলে গেছে।”

মোত্তালেব হোসেন বলেন, ২০০৮ সালে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত তার পাকা বাড়িটি মুহূর্তেই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সরকারের কাছে দ্রুত সহায়তা ও ভাঙনরোধে জিও ব্যাগ বা কংক্রিট ব্লক ফেলার দাবি জানান তিনি।

একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সুরুজ ইসলাম বলেন, নদীতে বাড়ি হারিয়ে এখন ভাঙা ইট-পাথর সংগ্রহ করে অন্য কোথাও মাথা গোঁজার চেষ্টা করছেন। আর আবু তালেব জানান, গত ৩৫ বছরে চার থেকে পাঁচবার বাড়ির স্থান পরিবর্তন করলেও এবার শেষ সম্বলটুকুও তিস্তা কেড়ে নিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, দ্রুত কার্যকর ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কয়েকশ বসতবাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইতোমধ্যে কয়েকটি বসতবাড়ি ও বিপুল কৃষিজমি নদীতে চলে গেছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ভাঙনের খবর পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন। ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে নদীতীর রক্ষার কাজ চলমান রয়েছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৫১ দশমিক ৯৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও নদীর তীব্র স্রোতে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে তিস্তা অববাহিকার ভাঙন পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিস্তার ভাঙনের প্রভাবে রংপুরের গঙ্গাচড়া ছাড়াও লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী, কুড়িগ্রামের চিলমারী, রাজারহাট, উলিপুর, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ এবং নীলফামারীর জলঢাকাসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে পানি ঢুকে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর