infoamaderdin@gmail.com বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

কৃষকের ২৪৫ টাকার মরিচ, বাজারে ৩২০ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ ১৫:০৭ পিএম

ফরিদপুরে টানা বৃষ্টিতে মরিচ খেতের ব্যাপক ক্ষতির প্রভাবে বাজারে কাঁচা মরিচের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি মরিচ ২৪০ থেকে ২৪৫ টাকায় কেনা হলেও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায়। ফলে আড়তদার ও মধ্যসত্ত্বভোগীদের হাত ঘুরেই প্রতি কেজিতে অন্তত ৫৫ টাকা দাম বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এতে একদিকে কৃষক লোকসানে পড়ছেন, অন্যদিকে বাড়তি দামের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, চলতি মাসের টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মরিচ খেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক ক্ষেতের গাছ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাজারে মরিচের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে আড়তদার ও ফড়িয়ারা প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত মুনাফা করছেন বলে দাবি তাদের।

ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কৃষকেরা যেখানে প্রতি মণ মরিচ ৯ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন, সেখানে একই মরিচ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে অন্তত ১২ হাজার টাকা প্রতি মণ হিসেবে। স্থানীয় বাজারে পরিবহন ব্যয় প্রায় না থাকলেও দামের এই বড় ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্রেতারা।

ফরিদপুরে সবচেয়ে বেশি মরিচের আবাদ হয় মধুখালী উপজেলায়। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সেখানে প্রায় ২ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। তবে টানা বৃষ্টিতে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মরিচ গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন রায়পুর, জাহাপুর ও মেগচামী ইউনিয়নের কৃষকেরা। মরিচের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা মিষ্টি কুমড়ার গাছও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

রায়পুর ইউনিয়নের হাটঘাটা গ্রামের কৃষক টুকু মণ্ডল জানান, তিনি ৫০ শতাংশ জমিতে মরিচের আবাদ করেছিলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে সব গাছ মারা যাওয়ায় উৎপাদন খরচের অর্ধেকও তুলতে পারেননি।

আরেক কৃষক খসরু মিয়া বলেন, সার ও কীটনাশকের দাম অনেক বেড়েছে। তার ওপর বৃষ্টিতে খেত নষ্ট হওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তার দাবি জানান।

মেগচামী ইউনিয়নের বামুন্দি গ্রামের কৃষক ক্ষিতিশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এবার মরিচের ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু গাছ পচে যাওয়ায় এখন খেতে মরিচ নেই বললেই চলে। ক্ষতি হয়েছে কৃষকের, অথচ লাভ করছেন আড়তদার ও ফড়িয়ারা।

তবে অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মধুখালী মরিচ বাজারের আড়তদার আলম মোল্লা। তিনি বলেন, বাজারে মরিচের আমদানি কমে যাওয়ায় পাইকারি দাম বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ মরিচ ৯ হাজার ৮০০ থেকে ১০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য দামেই মরিচ কেনা হচ্ছে এবং বাজারে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট নেই বলে দাবি করেন তিনি।

ভোক্তারা অবশ্য এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। সালথা উপজেলার বাসিন্দা বিধান মণ্ডল বলেন, ২৫০ গ্রাম কাঁচা মরিচ কিনতেই তাকে ৮০ টাকা খরচ করতে হয়েছে। প্রতিদিনই দাম বাড়ছে, অথচ বাজারে প্রশাসনের তদারকি চোখে পড়ে না।

ফরিদপুর শহরের জনতা ব্যাংকের মোড় এলাকার হোটেল মালিক দাউদ আকন্দ জানান, আগের দিন যে মরিচ ২৫০ টাকা কেজিতে কিনেছিলেন, পরদিন একই মরিচ কিনতে হয়েছে ৩০০ টাকায়। এতে ব্যবসার খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ফরিদপুরের উপপরিচালক মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ায় মরিচ খেত নষ্ট হওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দাম আরও কিছুদিন বাড়তি থাকতে পারে। তবে নিয়মিত বাজার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

মধুখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুব ইলাহি জানান, উপজেলায় অর্ধেকের বেশি মরিচ খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে অনেক কৃষককে সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


কৃষকের ২৪৫ টাকার মরিচ, বাজারে ৩২০ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ ১৫:০৭ পিএম

ফরিদপুরে টানা বৃষ্টিতে মরিচ খেতের ব্যাপক ক্ষতির প্রভাবে বাজারে কাঁচা মরিচের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি মরিচ ২৪০ থেকে ২৪৫ টাকায় কেনা হলেও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায়। ফলে আড়তদার ও মধ্যসত্ত্বভোগীদের হাত ঘুরেই প্রতি কেজিতে অন্তত ৫৫ টাকা দাম বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এতে একদিকে কৃষক লোকসানে পড়ছেন, অন্যদিকে বাড়তি দামের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, চলতি মাসের টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মরিচ খেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক ক্ষেতের গাছ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাজারে মরিচের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে আড়তদার ও ফড়িয়ারা প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত মুনাফা করছেন বলে দাবি তাদের।

ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কৃষকেরা যেখানে প্রতি মণ মরিচ ৯ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন, সেখানে একই মরিচ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে অন্তত ১২ হাজার টাকা প্রতি মণ হিসেবে। স্থানীয় বাজারে পরিবহন ব্যয় প্রায় না থাকলেও দামের এই বড় ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্রেতারা।

ফরিদপুরে সবচেয়ে বেশি মরিচের আবাদ হয় মধুখালী উপজেলায়। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সেখানে প্রায় ২ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। তবে টানা বৃষ্টিতে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মরিচ গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন রায়পুর, জাহাপুর ও মেগচামী ইউনিয়নের কৃষকেরা। মরিচের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা মিষ্টি কুমড়ার গাছও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

রায়পুর ইউনিয়নের হাটঘাটা গ্রামের কৃষক টুকু মণ্ডল জানান, তিনি ৫০ শতাংশ জমিতে মরিচের আবাদ করেছিলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে সব গাছ মারা যাওয়ায় উৎপাদন খরচের অর্ধেকও তুলতে পারেননি।

আরেক কৃষক খসরু মিয়া বলেন, সার ও কীটনাশকের দাম অনেক বেড়েছে। তার ওপর বৃষ্টিতে খেত নষ্ট হওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তার দাবি জানান।

মেগচামী ইউনিয়নের বামুন্দি গ্রামের কৃষক ক্ষিতিশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এবার মরিচের ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু গাছ পচে যাওয়ায় এখন খেতে মরিচ নেই বললেই চলে। ক্ষতি হয়েছে কৃষকের, অথচ লাভ করছেন আড়তদার ও ফড়িয়ারা।

তবে অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মধুখালী মরিচ বাজারের আড়তদার আলম মোল্লা। তিনি বলেন, বাজারে মরিচের আমদানি কমে যাওয়ায় পাইকারি দাম বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ মরিচ ৯ হাজার ৮০০ থেকে ১০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য দামেই মরিচ কেনা হচ্ছে এবং বাজারে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট নেই বলে দাবি করেন তিনি।

ভোক্তারা অবশ্য এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। সালথা উপজেলার বাসিন্দা বিধান মণ্ডল বলেন, ২৫০ গ্রাম কাঁচা মরিচ কিনতেই তাকে ৮০ টাকা খরচ করতে হয়েছে। প্রতিদিনই দাম বাড়ছে, অথচ বাজারে প্রশাসনের তদারকি চোখে পড়ে না।

ফরিদপুর শহরের জনতা ব্যাংকের মোড় এলাকার হোটেল মালিক দাউদ আকন্দ জানান, আগের দিন যে মরিচ ২৫০ টাকা কেজিতে কিনেছিলেন, পরদিন একই মরিচ কিনতে হয়েছে ৩০০ টাকায়। এতে ব্যবসার খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ফরিদপুরের উপপরিচালক মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ায় মরিচ খেত নষ্ট হওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দাম আরও কিছুদিন বাড়তি থাকতে পারে। তবে নিয়মিত বাজার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

মধুখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুব ইলাহি জানান, উপজেলায় অর্ধেকের বেশি মরিচ খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে অনেক কৃষককে সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর