খুলনায় নারীর বাসায় ‘আপত্তিকর অবস্থায়’ আটক, সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ
খুলনা নগরীর নিরালা এলাকায় এক নারীর বাসায় এক ব্যক্তিকে আপত্তিকর অবস্থায় আটকের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে ওই ব্যক্তিকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে আবু হোসেন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা, মারধর, মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা।
ঘটনার পর আহত এক সাংবাদিককে স্থানীয়রা উদ্ধার করে খুলনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। এ ঘটনায় ৩০ আগস্ট দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে খুলনা সদর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে খুলনা নগরীর নিরালা এলাকার ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের পাশের একটি গলিতে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে মুকুল নামে এক ব্যক্তি আজবা নামের এক নারীর বাসায় প্রবেশ করেন। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তারা ওই বাসায় গিয়ে একটি কক্ষে মুকুল ও আজবাকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান বলে দাবি করেন। এ সময় আজবার ছেলে মহশিন পাশের একটি কক্ষে হেডফোন কানে বসে ছিলেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।
ঘটনার খবর পেয়ে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী ঘটনাস্থলে গেলে মুকুলের পরিচয় জানতে চান। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি প্রথমে নিজেকে বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত লিটন হোসেনের ভাই হিসেবে পরিচয় দেন। পরে নিজেকে বাগেরহাট জেলা আদালতের নাজির ও পেশকার বলে দাবি করেন।
তবে তার আদালতের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বাগেরহাট জেলা আদালতে খোঁজ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মুকুল আদালতের একজন সেরেস্তাদার। ফলে তার দেওয়া পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত লিটন হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, পেশাগত কাজের কারণে অনেকের সঙ্গে তার পরিচয় রয়েছে এবং অনেকে তাকে চেনেন। তবে মুকুল তার ভাই নন এবং তার সঙ্গে মুকুলের কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও নেই বলে জানান তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুকুল দাবি করেন, আদালতের একটি মামলার বিষয়ে কথা বলার জন্য তিনি আজবার বাসায় এসেছিলেন। আজবা তার চাচাতো বোন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে আজবার এক আপন ফুফাতো ভাই গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, মুকুল তার কোনো ভাই নন। মুকুল কেন এমন পরিচয় দিয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও জানান।
ঘটনার বিষয়ে আজবার বক্তব্য জানতে গণমাধ্যমকর্মীরা তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মুকুল আবু হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে ফোন করেন। পরে আবু হোসেন ঘটনাস্থলে এসে স্থানীয় বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে মুকুলকে সেখান থেকে নিয়ে যান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আবু হোসেন নিজেকে মরহুম লিটু সাহেবের চাচাতো ভাই হিসেবে পরিচয় দেন। মুকুলকে কেন ওই পরিচয়ে নিয়ে যাওয়া হলো এবং তার আদালতের পদবি ও পরিচয় নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
হামলার ঘটনায় জাতীয় দৈনিক মুখপাত্রের ক্যামেরাপারসন, দৈনিক খুলনার খবরের স্টাফ রিপোর্টার ও চিটাগাং টাইমসের খুলনা জেলা প্রতিনিধি শেখ তৈয়ব আলী পর্বত আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। একই ঘটনায় ঢাকা টু ডে, চ্যানেল কর্ণফুলীর ও আমাদের দিন এর খুলনা জেলা প্রতিনিধি ফাহিম ইসলামও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলার সময় শেখ তৈয়ব আলী পর্বতের হাতে থাকা মোবাইল ফোনে থাবা দিয়ে সেটি ফেলে দেওয়া হয় এবং তার ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ঘটনার ভিডিও ধারণের সময় সাংবাদিক ফাহিম ইসলামের হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। তার বুক পকেটে থাকা ৫ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় আবু হোসেন উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। সাংবাদিকরা কীভাবে খুলনা শহরে সাংবাদিকতা করেন, তা ‘দেখে নেওয়ার’ পাশাপাশি অস্ত্র ও গুলি সংক্রান্ত হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।
হামলার পর স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা আহত সাংবাদিক শেখ তৈয়ব আলী পর্বতকে উদ্ধার করে খুলনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর খুলনা সদর থানা ও নিরালা পুলিশ ফাঁড়িকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরিফুল ইসলাম বলেন, “আমরা অভিযোগ পেয়েছি। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।”
এ ঘটনায় মুকুলের কথিত আদালতের পদবি ও পরিচয়, আজবার বাসায় তার যাওয়ার কারণ এবং পরে আবু হোসেনের মাধ্যমে তাকে ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মোবাইল ফোন, ক্যামেরা ও টাকা কেড়ে নেওয়ার অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক ও স্থানীয়রা।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। মুকুলের পরিচয়, আবু হোসেনের ভূমিকা এবং পুরো ঘটনার পেছনের কারণ কী—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে মুকুলের আদালতের পরিচয় ও পদবি, তিনি ওই বাসায় কেন গিয়েছিলেন এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও অন্যান্য অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত—তা দ্রুত খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: