infoamaderdin@gmail.com বৃহঃস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
১ শ্রাবণ ১৪৩৩

মনিরামপুরে ওয়ারেশ সনদ জালিয়াতির অভিযোগ: ১১০ বছরের দাদা, ১৩৪ বছরের পিতা!

মোঃ শাহ্ জালাল প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ ২০:০৭ পিএম

যশোরের মনিরামপুর পৌরসভায় বংশ, দাদা ও দাদীর নাম পরিবর্তন করে ওয়ারেশ সনদ নিয়ে অন্যের তিন একর ১৭ শতক জমি নামজারির চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, পৌরসচিব এবং লাইসেন্স পরিদর্শক ১০ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে প্রকৃত বংশ, দাদা ও দাদীর নাম পরিবর্তন করে ওয়ারেশ সনদ দেন। সেই সনদের মাধ্যমে অন্যের তিন একর ১৭ শতক জমি নিজেদের নামে নামজারির আবেদন করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে ভুক্তভোগীরা বুধবার এসিল্যান্ডের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে নামজারির আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, মনিরামপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অধীন কামালপুর গ্রামের মৃত আরফান আলী মোল্যার ছেলে হোসেন আলী মোল্যার ঠোটেকামালপুর মৌজায় ৩১৮ নম্বর খতিয়ানে তিন একর ১৭ শতক (৩১৭ শতক) জমি রয়েছে। হোসেন আলীর ওয়ারেশ রয়েছেন স্ত্রী আশরুপী বেগম, তিন ছেলে আলী আহমেদ, নুর মোহাম্মদ, তোফায়েল আহমেদ এবং একমাত্র মেয়ে শামছুন্নাহার। হোসেন আলীর ছোট ছেলে স্থানীয় মসজিদের ইমাম তোফায়েল আহমেদ জানান, তার বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া সম্পত্তি তিন ভাই ও এক বোন ভোগদখল করে আসছেন।

কিন্তু একই গ্রামের মৃত কিয়াম উদ্দিন বিশ্বাসের ছেলে মোহর আলী বাদী হয়ে নতুন ওয়ারেশ সনদ অনুযায়ী হোসেন আলী মোল্যার ৩১৮ নম্বর খতিয়ানের প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের তিন একর ১৭ শতক জমি তিনিসহ তার পাঁচ ভাই-বোনের নামে নামজারির আবেদন করেন গত ৭ জুন।

মৃত কিয়াম উদ্দিনের নামে পৌরসভা থেকে ওয়ারেশ সনদ দেওয়া হয়েছে চলতি বছরের ১৯ মে। পৌর সচিব ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা তফিকুল আলম স্বাক্ষরিত ওয়ারেশ সনদে মোহর আলীর পিতা কিয়াম উদ্দিন বিশ্বাসের পরিবর্তে কিয়াম উদ্দিন মোল্যা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বংশ পরিবর্তন করা হয়েছে। সে হিসেবে হোসেন আলী মোল্যার স্ত্রী যদি মোহর আলীর দাদি হন, তাহলে দাদির প্রকৃত নাম হবে আশরুপী বেগম। কিন্তু দাদির নাম পরিবর্তন করে সংযুক্ত করা হয়েছে সুখজান বিবি। মোহর আলীর দাদার নাম পরিবর্তন করে নতুন করে দেওয়া হয়েছে মৃত হোসেন আলী মোল্যা। ওই সনদে ছেলে কিয়াম উদ্দিনের বয়স দেখানো হয়েছে ১৩৬ বছর এবং পিতা হোসেন আলী মোল্যার বয়স দেওয়া হয়েছে ১১০ বছর। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মৃত কিয়াম উদ্দিন বিশ্বাস, মৃত হোসেন আলী মোল্যার কোনো ওয়ারেশ নন। শুধু তাই নয়, হোসেন আলী ছিলেন মোল্যা বংশের এবং কিয়াম উদ্দিন বিশ্বাস ছিলেন কারিগর বংশের লোক।

সরেজমিনে গিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, কিয়াম উদ্দিন এর আগে কামালপুর গ্রামের সম্পত্তি বিক্রি করে স্বাধীনতার আগে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে অভয়নগর উপজেলার বাঘুটিয়া গ্রামে জমি কিনে বসতবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। কামালপুর গ্রামের ট্রাকচালক বয়োবৃদ্ধ মকবুল হোসেন জানান, ইতোমধ্যে কিয়াম উদ্দিন বিশ্বাস ও তার স্ত্রী ফুলজান বিবির মৃত্যু হয়েছে। কিয়াম উদ্দিনের ওয়ারেশ রয়েছেন তিন মেয়ে কুলসুম বিবি, তারা বিবি, আকলিমা খাতুন এবং দুই ছেলে মোহর আলী ও ইজাহার আলী। এর মধ্যে মেয়ে কুলসুম বিবি ও তারা বেগমের মৃত্যু হয়েছে।

হোসেন আলী মোল্যার ছোট ছেলে, মসজিদের ইমাম তোফায়েল আহমেদ জানান, মৃত কিয়াম উদ্দিনের ছেলে মোহর আলী তাদের জমি ফাঁকি দিতে বংশ ও দাদা-দাদীর নাম পরিবর্তন করেছেন। মেজো ছেলে নূর মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, তিনি জানতে পেরেছেন পৌর সচিব তফিকুল আলম ও লাইসেন্স পরিদর্শক অমিয় চক্রবর্তী ১০ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে ভুয়া ওয়ারেশ সনদ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে নূর মোহাম্মদ বাদী হয়ে বুধবার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহির দায়ান আমিন জানান, ইতোমধ্যে মোহর আলীর নামজারির আবেদন খারিজ করা হয়েছে। তবে বংশ ও দাদা-দাদীর নাম পরিবর্তন করে ওয়ারেশ সনদ দেওয়ার ব্যাপারে পৌর সচিব তফিকুল আলম বলেন, চার সদস্যের তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুসারে ওয়ারেশ সনদ দেওয়া হয়েছে। তবে ওই কমিটির সদস্য, স্থানীয় পৌর কাউন্সিলরের দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু মুত্তালিব আলম বলেন, স্থানীয় প্রতিনিধি পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক অমিয় চক্রবর্তীসহ অন্য সদস্যদের সুপারিশে তিনি শুধু স্বাক্ষর করেছেন।

অমিয় চক্রবর্তী বলেন, প্রতিবেদন তৈরির সময় হয়তো বিষয়টি ভুল হতে পারে। পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেন জানান, এত বড় দুর্নীতির বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


মনিরামপুরে ওয়ারেশ সনদ জালিয়াতির অভিযোগ: ১১০ বছরের দাদা, ১৩৪ বছরের পিতা!

মোঃ শাহ্ জালাল

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬ ২০:০৭ পিএম

যশোরের মনিরামপুর পৌরসভায় বংশ, দাদা ও দাদীর নাম পরিবর্তন করে ওয়ারেশ সনদ নিয়ে অন্যের তিন একর ১৭ শতক জমি নামজারির চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, পৌরসচিব এবং লাইসেন্স পরিদর্শক ১০ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে প্রকৃত বংশ, দাদা ও দাদীর নাম পরিবর্তন করে ওয়ারেশ সনদ দেন। সেই সনদের মাধ্যমে অন্যের তিন একর ১৭ শতক জমি নিজেদের নামে নামজারির আবেদন করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে ভুক্তভোগীরা বুধবার এসিল্যান্ডের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে নামজারির আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, মনিরামপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অধীন কামালপুর গ্রামের মৃত আরফান আলী মোল্যার ছেলে হোসেন আলী মোল্যার ঠোটেকামালপুর মৌজায় ৩১৮ নম্বর খতিয়ানে তিন একর ১৭ শতক (৩১৭ শতক) জমি রয়েছে। হোসেন আলীর ওয়ারেশ রয়েছেন স্ত্রী আশরুপী বেগম, তিন ছেলে আলী আহমেদ, নুর মোহাম্মদ, তোফায়েল আহমেদ এবং একমাত্র মেয়ে শামছুন্নাহার। হোসেন আলীর ছোট ছেলে স্থানীয় মসজিদের ইমাম তোফায়েল আহমেদ জানান, তার বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া সম্পত্তি তিন ভাই ও এক বোন ভোগদখল করে আসছেন।

কিন্তু একই গ্রামের মৃত কিয়াম উদ্দিন বিশ্বাসের ছেলে মোহর আলী বাদী হয়ে নতুন ওয়ারেশ সনদ অনুযায়ী হোসেন আলী মোল্যার ৩১৮ নম্বর খতিয়ানের প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের তিন একর ১৭ শতক জমি তিনিসহ তার পাঁচ ভাই-বোনের নামে নামজারির আবেদন করেন গত ৭ জুন।

মৃত কিয়াম উদ্দিনের নামে পৌরসভা থেকে ওয়ারেশ সনদ দেওয়া হয়েছে চলতি বছরের ১৯ মে। পৌর সচিব ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা তফিকুল আলম স্বাক্ষরিত ওয়ারেশ সনদে মোহর আলীর পিতা কিয়াম উদ্দিন বিশ্বাসের পরিবর্তে কিয়াম উদ্দিন মোল্যা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বংশ পরিবর্তন করা হয়েছে। সে হিসেবে হোসেন আলী মোল্যার স্ত্রী যদি মোহর আলীর দাদি হন, তাহলে দাদির প্রকৃত নাম হবে আশরুপী বেগম। কিন্তু দাদির নাম পরিবর্তন করে সংযুক্ত করা হয়েছে সুখজান বিবি। মোহর আলীর দাদার নাম পরিবর্তন করে নতুন করে দেওয়া হয়েছে মৃত হোসেন আলী মোল্যা। ওই সনদে ছেলে কিয়াম উদ্দিনের বয়স দেখানো হয়েছে ১৩৬ বছর এবং পিতা হোসেন আলী মোল্যার বয়স দেওয়া হয়েছে ১১০ বছর। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মৃত কিয়াম উদ্দিন বিশ্বাস, মৃত হোসেন আলী মোল্যার কোনো ওয়ারেশ নন। শুধু তাই নয়, হোসেন আলী ছিলেন মোল্যা বংশের এবং কিয়াম উদ্দিন বিশ্বাস ছিলেন কারিগর বংশের লোক।

সরেজমিনে গিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, কিয়াম উদ্দিন এর আগে কামালপুর গ্রামের সম্পত্তি বিক্রি করে স্বাধীনতার আগে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে অভয়নগর উপজেলার বাঘুটিয়া গ্রামে জমি কিনে বসতবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। কামালপুর গ্রামের ট্রাকচালক বয়োবৃদ্ধ মকবুল হোসেন জানান, ইতোমধ্যে কিয়াম উদ্দিন বিশ্বাস ও তার স্ত্রী ফুলজান বিবির মৃত্যু হয়েছে। কিয়াম উদ্দিনের ওয়ারেশ রয়েছেন তিন মেয়ে কুলসুম বিবি, তারা বিবি, আকলিমা খাতুন এবং দুই ছেলে মোহর আলী ও ইজাহার আলী। এর মধ্যে মেয়ে কুলসুম বিবি ও তারা বেগমের মৃত্যু হয়েছে।

হোসেন আলী মোল্যার ছোট ছেলে, মসজিদের ইমাম তোফায়েল আহমেদ জানান, মৃত কিয়াম উদ্দিনের ছেলে মোহর আলী তাদের জমি ফাঁকি দিতে বংশ ও দাদা-দাদীর নাম পরিবর্তন করেছেন। মেজো ছেলে নূর মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, তিনি জানতে পেরেছেন পৌর সচিব তফিকুল আলম ও লাইসেন্স পরিদর্শক অমিয় চক্রবর্তী ১০ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে ভুয়া ওয়ারেশ সনদ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে নূর মোহাম্মদ বাদী হয়ে বুধবার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহির দায়ান আমিন জানান, ইতোমধ্যে মোহর আলীর নামজারির আবেদন খারিজ করা হয়েছে। তবে বংশ ও দাদা-দাদীর নাম পরিবর্তন করে ওয়ারেশ সনদ দেওয়ার ব্যাপারে পৌর সচিব তফিকুল আলম বলেন, চার সদস্যের তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুসারে ওয়ারেশ সনদ দেওয়া হয়েছে। তবে ওই কমিটির সদস্য, স্থানীয় পৌর কাউন্সিলরের দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু মুত্তালিব আলম বলেন, স্থানীয় প্রতিনিধি পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক অমিয় চক্রবর্তীসহ অন্য সদস্যদের সুপারিশে তিনি শুধু স্বাক্ষর করেছেন।

অমিয় চক্রবর্তী বলেন, প্রতিবেদন তৈরির সময় হয়তো বিষয়টি ভুল হতে পারে। পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেন জানান, এত বড় দুর্নীতির বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর