ঝিনাইদহ-যশোর ৬ লেন প্রকল্পে ধীরগতি, জমি অধিগ্রহণের দামে অসন্তোষ
ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার প্রকল্পে যেন কোনোভাবেই গতি ফিরছে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতির কাজের পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতায় বছরের পর বছর পার হলেও দৃশ্যমান হচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত মহাসড়ক। এতে একদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হচ্ছে, অন্যদিকে মহাসড়কে চলাচলকারী মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহ বাস টার্মিনাল থেকে কালীগঞ্জ পৌর শহরের কলাহাট পর্যন্ত অংশটি প্রকল্পের প্রথম ফেজ বা লট-১। এরপর কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারের শেষ পর্যন্ত অংশটি দ্বিতীয় ফেজ বা লট-২-এর আওতাভুক্ত। এই দুই লটে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে ৮ ধারার নোটিশ জারি করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন কার্যালয় সূত্র বলছে, ৮ ধারার নোটিশ জারির পর এ পর্যন্ত দুই লটের প্রায় ৫০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। অনেক জমির মালিক জমির দখল ছেড়ে দিয়েছেন। তবে প্রথম ফেজের আওতাধীন এলাকায় এখনো একাধিক জমির মালিক ৮ ধারার নোটিশে আপত্তি জানিয়েছেন। এসব আপত্তি যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে জমির মালিকদের অভিযোগ, অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের জমির ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। বিশেষ করে সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের খড়িখালী এলাকার নৃসিংহপুর মৌজার জমির মালিকরা মূল্য নির্ধারণে ব্যাপক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলেছেন।
তাদের দাবি, পাশাপাশি থাকা জমি হলেও মৌজা আলাদা হওয়ার কারণে অধিগ্রহণের নোটিশে মূল্য নির্ধারণে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রভাবশালীদের যোগসাজশে জমির মূল্য নির্ধারণে এমন তারতম্য করা হয়েছে।
নৃসিংহপুর মৌজার জমির মালিক কামরুজ্জামান বিল্লাহ বলেন, তাঁদের মৌজার পাশের একটি মৌজার জমির সঙ্গে দামের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কালীগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্যের লোকজন প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের জমির জন্য বেশি মূল্য আদায় করে নিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের জমির মূল্য মৌজা রেট অনুযায়ীও দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ঝিনাইদহ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নৃসিংহপুর মৌজায় বাগান শ্রেণির জমির সর্বনিম্ন রেজিস্ট্রি মূল্য ছিল প্রতি শতাংশ ৩৪ হাজার ৭৮৬ টাকা। অথচ অধিগ্রহণের ৮ ধারার নোটিশে একই শ্রেণির জমির মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৬২ টাকা।
আরেক জমির মালিক ইউসূফ সিদ্দিক বলেন, জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে একই মৌজায় জমি কেনাবেচার দলিলে যে মূল্য দেখানো হয়েছে, সেটির ভিত্তিতেই অধিগ্রহণমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তাঁরা সেই মূল্যও পাচ্ছেন না। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের জমি পানির দামে নেওয়া হচ্ছে।’
জমির মালিকদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে পাওয়া একটি ৮ ধারার নোটিশ ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মৌজা রেটের কপিতেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। নৃসিংহপুর মৌজার ১৪৯৪ নম্বর দাগের একটি বাগান শ্রেণির জমির অধিগ্রহণমূল্য ৮ ধারার নোটিশে প্রতি শতক ৩ হাজার ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত একই শ্রেণির জমির সর্বনিম্ন মৌজা রেট ছিল ৩৪ হাজার ৭৮৬ টাকা। অর্থাৎ অধিগ্রহণের নোটিশে নির্ধারিত মূল্য মৌজা রেটের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ কম। ২০২৩-২৪ সালে একই জমির মৌজা রেট নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি শতক ৩৮ হাজার ৯৭৫ টাকা।
শুধু বাগান শ্রেণির জমি নয়, ডাঙ্গা ও বাস্তু শ্রেণির জমির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মৌজা রেট যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন জমির মালিকরা।
ভুক্তভোগীরা জানান, জমির মূল্য নিয়ে তাঁরা একাধিকবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় আপত্তি জানিয়েছেন। তবে এতে কোনো সমাধান হয়নি। পরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দেন তাঁরা। পাশাপাশি অধিগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ তুলে শতাধিক জমির মালিক দুর্নীতি দমন কমিশনেও লিখিত অভিযোগ করেছেন।
তবে জেলা প্রশাসনের বক্তব্য, অধিগ্রহণের মূল্য নির্ধারণে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ৮ ধারার নোটিশ জারির আগে জমির মালিকদের আপত্তি ও শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরপরও জমির মূল্য নির্ধারণ নিয়ে কারও অভিযোগ থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
তিনি বলেন, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জমি কেনাবেচার যেসব দলিল হয়েছে, সেগুলোর গড় বিক্রয়মূল্য বিবেচনা করেই অধিগ্রহণের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের ভাষ্য, জমি কেনাবেচার সময় অনেকেই প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় কম মূল্য দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন করেন। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অধিগ্রহণের সময় ওই রেজিস্ট্রি দলিলের মূল্য বিবেচনায় নেওয়ায় বাজারমূল্য ও অধিগ্রহণমূল্যের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জমির মূল্য নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার পাশাপাশি প্রকল্পের নির্মাণকাজেও ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ চলায় যানবাহন চলাচলে সৃষ্টি হচ্ছে নানা সমস্যা। ধুলাবালি, যানজট ও সড়কের বিভিন্ন অংশের বেহাল অবস্থায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রী ও চালকদের।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জমি অধিগ্রহণের মূল্য নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি নির্মাণকাজেও গতি বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা হবে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: