infoamaderdin@gmail.com বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
৪ ভাদ্র ১৪৩৩

পিএসসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগে প্রশ্ন, স্বেচ্ছায় সরে গেলেন নাকি সরিয়ে দেওয়া হলো?

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৯ আগষ্ট ২০২৬ ১৭:০৮ পিএম

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগ ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করা হলেও পিএসসির ভেতরে আলোচনা রয়েছে, প্রশাসনিক ও নীতিগত কারণও তাঁর পদত্যাগের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে পাঁচ বছরের জন্য পিএসসি চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন মোবাশ্বের মোনেম। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই বছর পরই তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, তিনি স্বেচ্ছায় পদ ছেড়েছেন, নাকি সরকারের অনাগ্রহের কারণে তাঁকে সরে যেতে হয়েছে।

অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ

পদত্যাগের কারণ জানতে চাইলে অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম বলেন, পিএসসি চেয়ারম্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ এবং এ দায়িত্বে কাজের চাপ অনেক বেশি। প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিসসহ একাধিক শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে শারীরিক অস্বস্তি হওয়ায় তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন এবং শিক্ষকতা পেশাটিই তিনি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেন। তাই নিজের মূল পেশায় ফিরে যেতে চান।

তবে পিএসসির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, সরকার তাঁকে আর ওই পদে রাখতে না চাওয়াও পদত্যাগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংস্কারের উদ্যোগেই কি দূরত্ব?

মোবাশ্বের মোনেম দায়িত্ব নেওয়ার পর বিসিএস পরীক্ষার প্রচলিত ব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ‘সার্কুলার ইভাল্যুশন সিস্টেম’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। মৌখিক পরীক্ষায় প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে ‘কম্পিটেন্সি বেজড ভাইভা’ চালুর প্রক্রিয়াও শুরু হয়। বিসিএস প্রস্তুতিতে কোচিংনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি ৪৭তম বিসিএসের প্রশ্নপদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়।

সামনে বিসিএসের সিলেবাস ও প্রশ্নবিন্যাসে আরও পরিবর্তনের পরিকল্পনা ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তাঁর সময়ে পিএসসি ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ রোডম্যাপ গ্রহণ করে। একটি বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ এবং নিয়োগের সুপারিশ—পুরো প্রক্রিয়া ১২ মাসের মধ্যে শেষ করাই ছিল এই পরিকল্পনার লক্ষ্য।

কয়েকটি বিসিএসের জট কমানোর উদ্যোগ

‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিসিএস পরীক্ষার জট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৪৪তম, ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৮তম ও ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পরীক্ষায় ৭ হাজার ৬৫১ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৪৭তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা দ্রুত শেষ করে ফল প্রকাশ এবং ৫০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা দ্রুত মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে ৫০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা চলছে। আগামী ২৫ নভেম্বরের মধ্যে এর ভাইভা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যেই ৫০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পিএসসির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি বিসিএস এক বছরের মধ্যে শেষ করার নজির তৈরি হবে।

মোবাশ্বের মোনেম বলেন, দুই বছরে তিনি পিএসসিকে নতুন আঙ্গিকে সাজানোর চেষ্টা করেছেন। ৫০তম বিসিএসের মাধ্যমে এক বছরের বিসিএস পরিক্রমা বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি চলে গেলেও পিএসসি যেন এই গতি ও মান ধরে রাখে, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা।

পিএসসির সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা কমেছে। একই সঙ্গে কমিশনের ওপর জমে থাকা প্রশাসনিক চাপও কমেছে। কয়েকটি বিসিএস ও নন-ক্যাডার পরীক্ষার জট নিরসনের মাধ্যমে কমিশনের কার্যক্রমকে স্বাভাবিক গতিতে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের পর ভাবমূর্তি ফেরানোর উদ্যোগ

প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত পিএসসির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মধ্যে নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস স্থাপন, পরীক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, মোবাশ্বের মোনেমের দায়িত্বকালে প্রশ্নফাঁস বা নিয়োগ-বাণিজ্য নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সামনে আসেনি।

তবে সংস্কারের পাশাপাশি পিএসসির পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিও সামনে আনেন চেয়ারম্যান। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পিএসসির সঙ্গে জনপ্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল বলেও আলোচনা রয়েছে।

পিএসসির ভেতরে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে, কোনো একটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন উপদেষ্টা চেয়ারম্যানের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুই সম্ভাব্য কারণ নিয়ে আলোচনা

পিএসসির একজন কর্মকর্তার মতে, চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পেছনে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রথমত, মোবাশ্বের মোনেম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ফলে নির্বাচিত সরকার তাঁকে একই পদে রাখতে আগ্রহী নয়—এমন বার্তা তিনি বিভিন্ন মহল থেকে পেয়ে থাকতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, পিএসসির স্বায়ত্তশাসন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর অবস্থানও সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির কারণ হতে পারে।

পিএসসির সংশ্লিষ্টদের আরেকটি অংশের ধারণা, চেয়ারম্যানের সংস্কার উদ্যোগের কারণে স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাবাদী মহলের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়েছিল। বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টাও করা হচ্ছিল বলে তাঁদের দাবি। শেষ পর্যন্ত এসব পরিস্থিতি পদত্যাগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন।

এর আগেও চেয়ারম্যানদের মেয়াদ পূর্ণ হয়নি

গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন পিএসসি চেয়ারম্যানসহ ১২ জন সদস্য পদত্যাগ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিশনের কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

তবে পিএসসি চেয়ারম্যান পদে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার নজির খুব বেশি নেই। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮ জন চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র চারজন নির্ধারিত পুরো মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন। বাকি ১৪ জন মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি।

সংবিধান অনুযায়ী, পিএসসি চেয়ারম্যানের মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হলে এর আগেই দায়িত্ব শেষ হয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন, সরকারের অনীহা ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের কারণে অতীতেও অনেক চেয়ারম্যানকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদ ছাড়তে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করা চেয়ারম্যানদের মধ্যে প্রথম ছিলেন এ কিউ এম বজলুল করিম। তিনি ১৯৭২ সালের ১৫ মে থেকে ১৯৭৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর এম মইদুল ইসলাম ১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮২ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ ১৯৯৩ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। অধ্যাপক জেড এন তাহমিদা বেগম ২০০২ সালের ৯ মে থেকে ২০০৭ সালের ৭ মে পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে পাঁচ বছর পূর্ণ করেন।

সা’দত হোসেন ২০০৭ সালের মে থেকে ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত চার বছর সাড়ে ছয় মাস দায়িত্ব পালন করেন। ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়।

মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতাকে আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এর সঙ্গে প্রশাসনিক ও নীতিগত কোনো কারণ যুক্ত ছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে তাঁর পদত্যাগ স্বেচ্ছায়, নাকি সরকারের অনাগ্রহের কারণে—এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও তথ্য ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


পিএসসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগে প্রশ্ন, স্বেচ্ছায় সরে গেলেন নাকি সরিয়ে দেওয়া হলো?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ আগষ্ট ২০২৬ ১৭:০৮ পিএম

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগ ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করা হলেও পিএসসির ভেতরে আলোচনা রয়েছে, প্রশাসনিক ও নীতিগত কারণও তাঁর পদত্যাগের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে পাঁচ বছরের জন্য পিএসসি চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন মোবাশ্বের মোনেম। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই বছর পরই তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, তিনি স্বেচ্ছায় পদ ছেড়েছেন, নাকি সরকারের অনাগ্রহের কারণে তাঁকে সরে যেতে হয়েছে।

অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ

পদত্যাগের কারণ জানতে চাইলে অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম বলেন, পিএসসি চেয়ারম্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ এবং এ দায়িত্বে কাজের চাপ অনেক বেশি। প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিসসহ একাধিক শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে শারীরিক অস্বস্তি হওয়ায় তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন এবং শিক্ষকতা পেশাটিই তিনি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেন। তাই নিজের মূল পেশায় ফিরে যেতে চান।

তবে পিএসসির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, সরকার তাঁকে আর ওই পদে রাখতে না চাওয়াও পদত্যাগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংস্কারের উদ্যোগেই কি দূরত্ব?

মোবাশ্বের মোনেম দায়িত্ব নেওয়ার পর বিসিএস পরীক্ষার প্রচলিত ব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ‘সার্কুলার ইভাল্যুশন সিস্টেম’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। মৌখিক পরীক্ষায় প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে ‘কম্পিটেন্সি বেজড ভাইভা’ চালুর প্রক্রিয়াও শুরু হয়। বিসিএস প্রস্তুতিতে কোচিংনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি ৪৭তম বিসিএসের প্রশ্নপদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়।

সামনে বিসিএসের সিলেবাস ও প্রশ্নবিন্যাসে আরও পরিবর্তনের পরিকল্পনা ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তাঁর সময়ে পিএসসি ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ রোডম্যাপ গ্রহণ করে। একটি বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ এবং নিয়োগের সুপারিশ—পুরো প্রক্রিয়া ১২ মাসের মধ্যে শেষ করাই ছিল এই পরিকল্পনার লক্ষ্য।

কয়েকটি বিসিএসের জট কমানোর উদ্যোগ

‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিসিএস পরীক্ষার জট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৪৪তম, ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৮তম ও ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পরীক্ষায় ৭ হাজার ৬৫১ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৪৭তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা দ্রুত শেষ করে ফল প্রকাশ এবং ৫০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা দ্রুত মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে ৫০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা চলছে। আগামী ২৫ নভেম্বরের মধ্যে এর ভাইভা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যেই ৫০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পিএসসির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি বিসিএস এক বছরের মধ্যে শেষ করার নজির তৈরি হবে।

মোবাশ্বের মোনেম বলেন, দুই বছরে তিনি পিএসসিকে নতুন আঙ্গিকে সাজানোর চেষ্টা করেছেন। ৫০তম বিসিএসের মাধ্যমে এক বছরের বিসিএস পরিক্রমা বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি চলে গেলেও পিএসসি যেন এই গতি ও মান ধরে রাখে, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা।

পিএসসির সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা কমেছে। একই সঙ্গে কমিশনের ওপর জমে থাকা প্রশাসনিক চাপও কমেছে। কয়েকটি বিসিএস ও নন-ক্যাডার পরীক্ষার জট নিরসনের মাধ্যমে কমিশনের কার্যক্রমকে স্বাভাবিক গতিতে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের পর ভাবমূর্তি ফেরানোর উদ্যোগ

প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত পিএসসির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মধ্যে নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস স্থাপন, পরীক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, মোবাশ্বের মোনেমের দায়িত্বকালে প্রশ্নফাঁস বা নিয়োগ-বাণিজ্য নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সামনে আসেনি।

তবে সংস্কারের পাশাপাশি পিএসসির পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিও সামনে আনেন চেয়ারম্যান। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পিএসসির সঙ্গে জনপ্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল বলেও আলোচনা রয়েছে।

পিএসসির ভেতরে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে, কোনো একটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন উপদেষ্টা চেয়ারম্যানের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুই সম্ভাব্য কারণ নিয়ে আলোচনা

পিএসসির একজন কর্মকর্তার মতে, চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পেছনে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রথমত, মোবাশ্বের মোনেম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ফলে নির্বাচিত সরকার তাঁকে একই পদে রাখতে আগ্রহী নয়—এমন বার্তা তিনি বিভিন্ন মহল থেকে পেয়ে থাকতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, পিএসসির স্বায়ত্তশাসন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর অবস্থানও সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির কারণ হতে পারে।

পিএসসির সংশ্লিষ্টদের আরেকটি অংশের ধারণা, চেয়ারম্যানের সংস্কার উদ্যোগের কারণে স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাবাদী মহলের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়েছিল। বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টাও করা হচ্ছিল বলে তাঁদের দাবি। শেষ পর্যন্ত এসব পরিস্থিতি পদত্যাগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন।

এর আগেও চেয়ারম্যানদের মেয়াদ পূর্ণ হয়নি

গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন পিএসসি চেয়ারম্যানসহ ১২ জন সদস্য পদত্যাগ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিশনের কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

তবে পিএসসি চেয়ারম্যান পদে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার নজির খুব বেশি নেই। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮ জন চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র চারজন নির্ধারিত পুরো মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন। বাকি ১৪ জন মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি।

সংবিধান অনুযায়ী, পিএসসি চেয়ারম্যানের মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হলে এর আগেই দায়িত্ব শেষ হয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন, সরকারের অনীহা ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের কারণে অতীতেও অনেক চেয়ারম্যানকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদ ছাড়তে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করা চেয়ারম্যানদের মধ্যে প্রথম ছিলেন এ কিউ এম বজলুল করিম। তিনি ১৯৭২ সালের ১৫ মে থেকে ১৯৭৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর এম মইদুল ইসলাম ১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮২ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ ১৯৯৩ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। অধ্যাপক জেড এন তাহমিদা বেগম ২০০২ সালের ৯ মে থেকে ২০০৭ সালের ৭ মে পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে পাঁচ বছর পূর্ণ করেন।

সা’দত হোসেন ২০০৭ সালের মে থেকে ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত চার বছর সাড়ে ছয় মাস দায়িত্ব পালন করেন। ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়।

মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতাকে আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এর সঙ্গে প্রশাসনিক ও নীতিগত কোনো কারণ যুক্ত ছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে তাঁর পদত্যাগ স্বেচ্ছায়, নাকি সরকারের অনাগ্রহের কারণে—এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও তথ্য ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর