পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হলেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। সোমবার (২০ জুলাই) স্থানীয় সময় বাকিংহাম প্যালেসে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নেন তিনি। পরে লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে দেশের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন।
এর আগে কিয়ার স্টারমার রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়েন। বার্নহ্যামের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে গত চার বছরে যুক্তরাজ্য পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী পেল, যা দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
বার্নহ্যাম তাঁর প্রথম ভাষণে বলেন, “আমরা যথেষ্ট ভালো ছিলাম না। আমাদের আরও ভালো হতে হবে, এবং আমরা সেটাই করব।” তিনি জানান, চলতি বছরের শেষের দিকে যুক্তরাজ্যের জন্য একটি ১০ বছরের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে। এতে অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তুলে ধরা হবে।
নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকারের প্রধান লক্ষ্য হবে রাজনীতির প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন। তিনি এই সময়কে যুক্তরাজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এখান থেকেই দেশের নতুন যাত্রা শুরু হবে।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে দ্রুত কর্মসূচি ঘোষণা, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে আরও বেশি প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
বার্নহ্যাম জানান, যুক্তরাজ্যকে আবারও শক্তিশালী শিল্পোন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করবে। শিল্পে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করার পাশাপাশি জনসেবাকে আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
গৃহহীন মানুষের সংকট নিরসনে তিনি বলেন, দেশের কোনো মানুষ যেন রাস্তায় রাত কাটাতে বাধ্য না হন, সেটিই হবে তাঁর সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। পাশাপাশি আরও বেশি কাউন্সিল হাউস নির্মাণ, তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেন।
সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির হতাশাজনক ফলাফলের পর কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতরে চাপ তৈরি হয়। পরে তিনি পদত্যাগ করলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম আবার হাউস অব কমন্সে ফেরেন এবং দলীয় ভোটে লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হন। এরপর রাজা তৃতীয় চার্লস তাঁকে সরকার গঠনের আহ্বান জানানোর পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর বার্নহ্যামের প্রথম বড় কাজ হচ্ছে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন। ইতোমধ্যে আগের সরকারের কারাগারবিষয়ক মন্ত্রী লর্ড টিম্পসন পদত্যাগ করেছেন। ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, নতুন মন্ত্রী নিয়োগ ও দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের কাজ চলছে। তবে মন্ত্রিসভার পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
৫৬ বছর বয়সী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইংল্যান্ডের মেরসিসাইডে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো লেবার পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সরকারের সময় স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
২০১০ ও ২০১৫ সালে লেবার পার্টির নেতৃত্বের দৌড়ে ব্যর্থ হলেও ২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টরের মেয়র নির্বাচিত হন এবং টানা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় স্থানীয় জনগণের স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় তিনি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বের ধারাবাহিক পরিবর্তনের কারণে আস্থার সংকটে থাকা যুক্তরাজ্যে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: