infoamaderdin@gmail.com বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
৪ ভাদ্র ১৪৩৩

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ কমছে, দখল তবে কার হাতে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ১৯ আগষ্ট ২০২৬ ১৩:০৮ পিএম

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষেত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। কয়েক মাস ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি করে আসছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। তবে সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সময়ে সেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ৮০ শতাংশের বেশি জাহাজ ওমানের দিকের পথ ব্যবহার করেছে। স্যাটেলাইট ও জাহাজের ট্রান্সপন্ডার তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে কেপলার।

হরমুজ প্রণালির উত্তরাংশের কাছাকাছি পথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে দাবি করে আসছে ইরান। ওই পথ ব্যবহারকারী বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। তবে হামলার ঝুঁকি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে অধিকাংশ জাহাজ ইরানের নির্দেশ উপেক্ষা করে ওমানের দিকের পথ বেছে নিচ্ছে। জাহাজ মালিকদের বড় একটি অংশের ধারণা, মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতির কারণে ওই পথে চলাচল তুলনামূলক নিরাপদ।

কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হুমায়ুন ফালাকশাহী মনে করেন, ইরান অন্তত আংশিকভাবে হরমুজ প্রণালির উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

এক মাসেই বদলে গেছে পরিস্থিতি

বর্তমান চিত্র এক মাস আগের পরিস্থিতির তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। তখন ওমানের দিকের পথ দিয়ে প্রায় কোনো জাহাজ চলাচল করছিল না। এখন সেই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল দ্রুত বাড়ছে। বিপরীতে ইরানের পছন্দের পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে গেছে।

এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের সুযোগও ইরানের কমে গেছে। বসন্তকালে ইরান এই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায় করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি সপ্তাহে শেষ হলেও কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বাস্তবে ইরান আগের মতো টোল আদায় করতে পারছে না।

পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিং বলেন, ইরানের টোল আদায়ের আহ্বানে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ জাহাজ সাড়া দিতে আগ্রহী নয়। ফলে ওমানের পথ ব্যবহার করাই তাদের কাছে বেশি যৌক্তিক হয়ে উঠেছে।

তেল পরিবহনে নতুন কৌশল

হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নতুন কৌশল নিয়েছে। দেশগুলো পারস্য উপসাগর থেকে তেল পরিবহনের জন্য ভেরি লার্জ ক্রুড অয়েল ক্যারিয়ার বা ভিএলসিসি ভাড়া করেছে। এগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় আকারের তেলবাহী জাহাজ।

লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপোর তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়ে ওমান উপসাগরের তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় গিয়ে তেল অন্য জাহাজে স্থানান্তর করছে। এতে মূল জাহাজগুলোকে ইরানের হামলার ঝুঁকি থেকে কিছুটা দূরে রাখা সম্ভব হচ্ছে।

তবে ইরানের হামলা এড়াতে কিছু জাহাজ তাদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখছে। অনেক সময় টানা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত এগুলো নিজেদের অবস্থান গোপন রাখে। ফলে এসব জাহাজকে ‘ডার্ক ট্রাফিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কিছু জাহাজ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও প্রচলিত ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় এগুলোর গতিবিধি নির্ভুলভাবে অনুসরণ করা কঠিন।

মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ছে

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিও পরিস্থিতির ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। সমুদ্রে উল্লেখযোগ্য নৌ শক্তি মোতায়েন থাকায় হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর মার্কিন বাহিনী নজর রাখছে।

মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট গত সপ্তাহে দাবি করেন, এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরাসরি এবং বিকল্প পথ মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হতো। ফলে বর্তমান পরিবহন আগের তুলনায় কম হলেও তা যুদ্ধের শুরুর দিকের পরিস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি।

এই তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্পের এ দাবিকে সরলভাবে পুরোপুরি সত্য বলা যায় না। কারণ ইরান এখনো জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম হচ্ছে এবং যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

তাহলে নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে শুধু ‘ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। ইরান আগের তুলনায় নিয়ন্ত্রণ হারালেও এখনো জলপথটিতে হামলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী সেখানে টহল দিচ্ছে এবং জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

ড্যান পিকারিংয়ের মতে, ইরান শুরু থেকেই হরমুজ প্রণালির ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বরং তাদের মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিরোধ তৈরি করা এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণের একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করা। তবে যদি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া তেল পরিবহনের হিসাব সঠিক হয়, তাহলে এক-দুই মাস আগের তুলনায় ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রভাব অবশ্যই কমেছে।

অ্যান্ডি লিপোর মূল্যায়নও প্রায় একই। তার মতে, সব তথ্য ও প্রচারিত শিরোনাম সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তবে এটুকু বলা যায়, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আংশিকভাবে হারিয়েছে।

ওমান-ইরান আলোচনায় নতুন সমীকরণ

হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ওমান ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনা। দুই দেশ জলপথটিতে অবাধ নৌ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে। তবে এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুক্ত নেই।

ওমানের সঙ্গে ইরানের আলোচনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও নিয়ন্ত্রণের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইরানের একচ্ছত্র প্রভাব আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাব বেড়েছে এবং ওমানের দিকের পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। ফলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন কোনো একক পক্ষের হাতে নেই; বরং সামরিক শক্তি, জাহাজ চলাচল, কূটনীতি ও তেল পরিবহনের ওপর নির্ভর করে এর নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ কমছে, দখল তবে কার হাতে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ আগষ্ট ২০২৬ ১৩:০৮ পিএম

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষেত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। কয়েক মাস ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি করে আসছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। তবে সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সময়ে সেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ৮০ শতাংশের বেশি জাহাজ ওমানের দিকের পথ ব্যবহার করেছে। স্যাটেলাইট ও জাহাজের ট্রান্সপন্ডার তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে কেপলার।

হরমুজ প্রণালির উত্তরাংশের কাছাকাছি পথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে দাবি করে আসছে ইরান। ওই পথ ব্যবহারকারী বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। তবে হামলার ঝুঁকি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে অধিকাংশ জাহাজ ইরানের নির্দেশ উপেক্ষা করে ওমানের দিকের পথ বেছে নিচ্ছে। জাহাজ মালিকদের বড় একটি অংশের ধারণা, মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতির কারণে ওই পথে চলাচল তুলনামূলক নিরাপদ।

কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হুমায়ুন ফালাকশাহী মনে করেন, ইরান অন্তত আংশিকভাবে হরমুজ প্রণালির উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

এক মাসেই বদলে গেছে পরিস্থিতি

বর্তমান চিত্র এক মাস আগের পরিস্থিতির তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। তখন ওমানের দিকের পথ দিয়ে প্রায় কোনো জাহাজ চলাচল করছিল না। এখন সেই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল দ্রুত বাড়ছে। বিপরীতে ইরানের পছন্দের পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে গেছে।

এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের সুযোগও ইরানের কমে গেছে। বসন্তকালে ইরান এই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায় করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি সপ্তাহে শেষ হলেও কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বাস্তবে ইরান আগের মতো টোল আদায় করতে পারছে না।

পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিং বলেন, ইরানের টোল আদায়ের আহ্বানে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ জাহাজ সাড়া দিতে আগ্রহী নয়। ফলে ওমানের পথ ব্যবহার করাই তাদের কাছে বেশি যৌক্তিক হয়ে উঠেছে।

তেল পরিবহনে নতুন কৌশল

হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নতুন কৌশল নিয়েছে। দেশগুলো পারস্য উপসাগর থেকে তেল পরিবহনের জন্য ভেরি লার্জ ক্রুড অয়েল ক্যারিয়ার বা ভিএলসিসি ভাড়া করেছে। এগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় আকারের তেলবাহী জাহাজ।

লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপোর তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়ে ওমান উপসাগরের তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় গিয়ে তেল অন্য জাহাজে স্থানান্তর করছে। এতে মূল জাহাজগুলোকে ইরানের হামলার ঝুঁকি থেকে কিছুটা দূরে রাখা সম্ভব হচ্ছে।

তবে ইরানের হামলা এড়াতে কিছু জাহাজ তাদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখছে। অনেক সময় টানা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত এগুলো নিজেদের অবস্থান গোপন রাখে। ফলে এসব জাহাজকে ‘ডার্ক ট্রাফিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কিছু জাহাজ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও প্রচলিত ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় এগুলোর গতিবিধি নির্ভুলভাবে অনুসরণ করা কঠিন।

মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ছে

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিও পরিস্থিতির ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। সমুদ্রে উল্লেখযোগ্য নৌ শক্তি মোতায়েন থাকায় হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর মার্কিন বাহিনী নজর রাখছে।

মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট গত সপ্তাহে দাবি করেন, এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরাসরি এবং বিকল্প পথ মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হতো। ফলে বর্তমান পরিবহন আগের তুলনায় কম হলেও তা যুদ্ধের শুরুর দিকের পরিস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি।

এই তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্পের এ দাবিকে সরলভাবে পুরোপুরি সত্য বলা যায় না। কারণ ইরান এখনো জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম হচ্ছে এবং যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

তাহলে নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে শুধু ‘ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। ইরান আগের তুলনায় নিয়ন্ত্রণ হারালেও এখনো জলপথটিতে হামলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী সেখানে টহল দিচ্ছে এবং জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

ড্যান পিকারিংয়ের মতে, ইরান শুরু থেকেই হরমুজ প্রণালির ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বরং তাদের মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিরোধ তৈরি করা এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণের একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করা। তবে যদি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া তেল পরিবহনের হিসাব সঠিক হয়, তাহলে এক-দুই মাস আগের তুলনায় ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রভাব অবশ্যই কমেছে।

অ্যান্ডি লিপোর মূল্যায়নও প্রায় একই। তার মতে, সব তথ্য ও প্রচারিত শিরোনাম সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তবে এটুকু বলা যায়, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আংশিকভাবে হারিয়েছে।

ওমান-ইরান আলোচনায় নতুন সমীকরণ

হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ওমান ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনা। দুই দেশ জলপথটিতে অবাধ নৌ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে। তবে এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুক্ত নেই।

ওমানের সঙ্গে ইরানের আলোচনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও নিয়ন্ত্রণের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইরানের একচ্ছত্র প্রভাব আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাব বেড়েছে এবং ওমানের দিকের পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। ফলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন কোনো একক পক্ষের হাতে নেই; বরং সামরিক শক্তি, জাহাজ চলাচল, কূটনীতি ও তেল পরিবহনের ওপর নির্ভর করে এর নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর