মার্কিন স্থল অভিযানের শঙ্কা, আক্রমণাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ৬০ দিনের সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। সমঝোতা নবায়ন না হওয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযানের আশঙ্কার মধ্যে ইরানও প্রতিরক্ষা কৌশলে বড় পরিবর্তন এনে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রোববার রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদুল্লাহ জাভানি বলেন, দেশ রক্ষায় প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে ইরানের বাহিনী প্রস্তুত। এতদিন ইরান আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থাকলেও এখন প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে বলেও জানান তিনি।
চলতি বছরের মে মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ‘ইসলামাবাদ স্মারক’ নামে একটি সমঝোতায় সই করেন। কয়েক মাস ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান এবং সামরিক অভিযান বন্ধ করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
সমঝোতা অনুযায়ী, ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি করার কথা ছিল। ওই চুক্তি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথাও বলা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। ফলে সমঝোতার মেয়াদ আর বাড়েনি।
সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জাভানি বলেন, শত্রুপক্ষ প্রথমে যুদ্ধ শুরু করেছিল এবং এতদিন ইরান আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে ছিল। এখন তারা আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে পারে। তবে সম্ভাব্য অভিযানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি তিনি। বরং প্রতিপক্ষের জন্য বড় ধরনের ‘স্ট্র্যাটেজিক সারপ্রাইজ’ অপেক্ষা করছে বলে সতর্ক করেছেন।
ইরানের আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বিও গত সপ্তাহে পাল্টা হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হতে পারে।
ইরানের কয়েকটি গণমাধ্যমে বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা স্থল হামলার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকে এমন অভিযানের বাস্তবতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে ইরানে স্থল অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন স্পষ্ট প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
এর মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি আইআরজিসির পুরোনো ও বিশ্বস্ত কয়েকজন কমান্ডারকে সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নেতৃত্বে এই পরিবর্তনের পরই ইরানের পক্ষ থেকে ‘অফেন্সিভ ডিটারেন্স’ বা আক্রমণাত্মক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ঘোষণা আসে।
আইআরজিসির নতুন প্রধান মেজর জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদিকে শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ এবং শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওয়াহিদি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে এবং দেশটিকে সমুদ্র অবরোধের মাধ্যমে ঘিরে রাখা হয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে দ্রুত আমেরিকার ভূখণ্ড ঘোষণা করা হবে—এমন মন্তব্যও করেন তিনি। পরে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়, ট্রাম্প ওই মন্তব্য কৌতুক করে করেছিলেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের ভূখণ্ডে কোনো মার্কিন সেনা প্রবেশ করলে তাদের হত্যা বা বন্দি করার জন্য পুরস্কার দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, আগ্রাসনকারীদের আঘাত করার সব পথ খোলা রয়েছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই দাবি করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে স্থল অভিযান চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। তবে অপরিপক্ব পরিকল্পনার কারণে তারা শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যায় বলে দাবি তার।
রেজাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে দুই সপ্তাহ ধরে চলা উত্তেজনার সময় মার্কিন বাহিনী ইরানের ১৫টি প্রদেশের প্রায় ৫০টি শহরে বিমান হামলা চালায়। এসব হামলায় সড়ক, সেতু, সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার, রাডার ও উপকূলীয় সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করা হয়। দক্ষিণ ইরানের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করাও এসব হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
রেজাই মনে করেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ এবং ইসফাহানের পরমাণু স্থাপনায় পৌঁছানোর জন্য স্থল অভিযানের পথ তৈরি করাই ওই হামলাগুলোর অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযানের জন্য বিপুলসংখ্যক সেনা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, হরমুজে স্থল অভিযান চালাতে অন্তত এক লাখ সেনার প্রয়োজন হবে। ৪০ থেকে ৫০ হাজার সেনা দিয়ে এ ধরনের অভিযান চালানো কঠিন। বিশেষ করে জাগ্রোস পর্বতমালা ও ফার্স প্রদেশ অতিক্রম করা মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
এ পরিস্থিতিতে ইরানের সামরিক বাহিনীও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূল ও দ্বীপগুলোতে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করেছে। গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির আশপাশে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য বিশেষ বাহিনী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ইরানের সামরিক মুখপাত্র মোহাম্মদ-রেজা আকরামিনিয়া বলেন, ইরানের ভূখণ্ডে বিদেশি সেনাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। কোনো মার্কিন সেনা ইরানের দ্বীপে পা রাখলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের ওপর হামলা চালানো হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তেও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ঠেকাতে প্রস্তুতি জোরদার করেছে তেহরান। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থানকারী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টিও সমঝোতার সঙ্গে যুক্ত করেছে ইরান। আইআরজিসির রাজনৈতিক প্রধান ইয়াদুল্লাহ জাভানি বলেছেন, ইসলামাবাদ সমঝোতার শর্ত যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি মেনে চললে তবেই হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়াকে যুদ্ধ শুরুর সরাসরি কারণ হিসেবে দেখছে না। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই বলেন, কোনো হুমকি বা আল্টিমেটামের কারণে ইরান তার নীতি পরিবর্তন করে না। জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করেই তেহরান সিদ্ধান্ত নেবে।
হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনাও চলছে। তবে আইনি জটিলতা এবং কয়েকটি পক্ষের বাধার কারণে সেই আলোচনা ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কূটনৈতিক সমাধানের বদলে দুই পক্ষের সামরিক প্রস্তুতি ও পাল্টাপাল্টি হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এখন কূটনৈতিক আলোচনা আবার গতি পায়, নাকি সংঘাত নতুন করে সামরিক রূপ নেয়—সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: