infoamaderdin@gmail.com বৃহঃস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় শৌচাগার পরিষ্কার করছেন শিক্ষকরা, নোংরা টয়লেটে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিক্ষার্থী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬ ১৫:০৭ পিএম

দেশের ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কোনো পদ না থাকায় শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার থেকে শুরু করে শৌচাগার ধোয়া-মোছার কাজও করতে হচ্ছে শিক্ষকদের। এতে একদিকে যেমন পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা জানান, প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষ, টয়লেট ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রাখতে গিয়ে তাদের মূল দায়িত্বের বাইরে কাজ করতে হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় অনেক সময় নিজেদের অর্থ ব্যয় করে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দিলেও সেটি স্থায়ী সমাধান নয়।

ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২২ সালের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৪৩ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লিঙ্গভিত্তিক পৃথক ও মানসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। এছাড়া ৭ শতাংশ বিদ্যালয়ে কোনো টয়লেটই নেই। যেসব বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক রয়েছে, সেগুলোও নিয়মিত পরিষ্কারের জন্য নির্দিষ্ট জনবলের অভাবে অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় পড়ে থাকে।

রাজধানীর লালবাগের হাজী ইবরাহীম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় বিদ্যালয়ের স্যানিটেশন ব্যবস্থা, সুয়ারেজ লাইন, শ্রেণিকক্ষ ও খেলার মাঠ পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টির সময় আঙিনায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে সেখানে ডেঙ্গুবাহী মশার প্রজননের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বাধ্য হয়ে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদেরই ঝাড়ু, বেলচা ও বালতি হাতে নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হয়।

ধানমন্ডির আইয়ুব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহিদা আক্তার বলেন, বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার পর বিদ্যালয় পরিষ্কার করার জন্য কোনো কর্মী না থাকায় শিক্ষকদেরই শ্রেণিকক্ষ, বাথরুম ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করতে হয়। অনেক বিদ্যালয় নিজস্ব অর্থায়নে ক্লিনার রাখলেও তাদের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে সমস্যা থেকেই যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিচ্ছন্ন টয়লেট শিশুদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. নাদিম আহমেদের মতে, নোংরা টয়লেট ব্যবহারের কারণে বিশেষ করে মেয়েশিশুদের মূত্রনালির সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। টয়লেট এড়াতে অনেক শিশু কম পানি পান করে বা দীর্ঘ সময় প্রস্রাব চেপে রাখে, যা ভবিষ্যতে গুরুতর শারীরিক জটিলতার কারণ হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। অনেক শিশু টয়লেট ব্যবহার না করে উন্মুক্ত স্থানে যেতে বাধ্য হয়, ফলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও জন্ডিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

এদিকে গত ১১ মে এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অন্তত একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের দাবি জানায়। সংগঠনটির দাবি, যেখানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় একাধিক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছে, সেখানে সবচেয়ে সংবেদনশীল শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লিনার না থাকা বৈষম্যমূলক।

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামসুদ্দীন মাসুদ বলেন, ছোট শিশুদের বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্লিনার না থাকায় শিক্ষকদেরই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হচ্ছে, যা যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, তেমনি পাঠদানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি দ্রুত প্রতিটি বিদ্যালয়ে ক্লিনার নিয়োগের দাবি জানান।

এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় শৌচাগার পরিষ্কার করছেন শিক্ষকরা, নোংরা টয়লেটে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিক্ষার্থী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬ ১৫:০৭ পিএম

দেশের ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কোনো পদ না থাকায় শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার থেকে শুরু করে শৌচাগার ধোয়া-মোছার কাজও করতে হচ্ছে শিক্ষকদের। এতে একদিকে যেমন পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা জানান, প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষ, টয়লেট ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রাখতে গিয়ে তাদের মূল দায়িত্বের বাইরে কাজ করতে হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় অনেক সময় নিজেদের অর্থ ব্যয় করে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দিলেও সেটি স্থায়ী সমাধান নয়।

ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২২ সালের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৪৩ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লিঙ্গভিত্তিক পৃথক ও মানসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। এছাড়া ৭ শতাংশ বিদ্যালয়ে কোনো টয়লেটই নেই। যেসব বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক রয়েছে, সেগুলোও নিয়মিত পরিষ্কারের জন্য নির্দিষ্ট জনবলের অভাবে অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় পড়ে থাকে।

রাজধানীর লালবাগের হাজী ইবরাহীম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় বিদ্যালয়ের স্যানিটেশন ব্যবস্থা, সুয়ারেজ লাইন, শ্রেণিকক্ষ ও খেলার মাঠ পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টির সময় আঙিনায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে সেখানে ডেঙ্গুবাহী মশার প্রজননের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বাধ্য হয়ে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদেরই ঝাড়ু, বেলচা ও বালতি হাতে নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হয়।

ধানমন্ডির আইয়ুব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহিদা আক্তার বলেন, বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার পর বিদ্যালয় পরিষ্কার করার জন্য কোনো কর্মী না থাকায় শিক্ষকদেরই শ্রেণিকক্ষ, বাথরুম ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করতে হয়। অনেক বিদ্যালয় নিজস্ব অর্থায়নে ক্লিনার রাখলেও তাদের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে সমস্যা থেকেই যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিচ্ছন্ন টয়লেট শিশুদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. নাদিম আহমেদের মতে, নোংরা টয়লেট ব্যবহারের কারণে বিশেষ করে মেয়েশিশুদের মূত্রনালির সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। টয়লেট এড়াতে অনেক শিশু কম পানি পান করে বা দীর্ঘ সময় প্রস্রাব চেপে রাখে, যা ভবিষ্যতে গুরুতর শারীরিক জটিলতার কারণ হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। অনেক শিশু টয়লেট ব্যবহার না করে উন্মুক্ত স্থানে যেতে বাধ্য হয়, ফলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও জন্ডিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

এদিকে গত ১১ মে এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অন্তত একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের দাবি জানায়। সংগঠনটির দাবি, যেখানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় একাধিক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছে, সেখানে সবচেয়ে সংবেদনশীল শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লিনার না থাকা বৈষম্যমূলক।

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামসুদ্দীন মাসুদ বলেন, ছোট শিশুদের বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্লিনার না থাকায় শিক্ষকদেরই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হচ্ছে, যা যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, তেমনি পাঠদানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি দ্রুত প্রতিটি বিদ্যালয়ে ক্লিনার নিয়োগের দাবি জানান।

এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর