খাওয়ার অনুপযোগী ভারত থেকে আমদানিকৃত সাড়ে ১১ হাজার টন চাল, চালান ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত
খাওয়ার অনুপযোগী হিসেবে পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়ায় সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় ভারত থেকে আমদানি করা ১১ হাজার ৫০০ টন চালের একটি চালান ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর চালের একটি অংশ খালাস করা হলেও পরবর্তী পরীক্ষায় এর মান নিয়ে আপত্তি ওঠায় বাকি চাল খালাস স্থগিত রাখা হয়েছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য মহলেও নতুন আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের প্রভাবশালী ব্যবসায়িক দৈনিক দ্য হিন্দু বিজনেস লাইন জানিয়েছে, জি-টু-জি চুক্তির আওতায় পাঠানো চালবাহী ‘এমভি এইচটি পাইওনিয়ার’ জাহাজটি গত ২১ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পরদিন ২২ জুলাই চালের নমুনা পরীক্ষা করে সেটিকে প্রাথমিকভাবে মানুষের খাদ্য হিসেবে উপযোগী বলে প্রত্যয়ন দেওয়া হয়। এরপর ২৩ ও ২৪ জুলাই চালানের একটি অংশ খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়।
খালাস করা চালের একটি অংশ তেজগাঁও, হালিশহর ও দেওয়ানহাট কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগারে (সিএসডি) এবং কিছু চাল জয়দেবপুরের স্থানীয় সংরক্ষণাগারে পাঠানো হয়। তবে ২৫ জুলাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চালের মান খারাপ এবং তা মানুষের খাদ্য হিসেবে উপযোগী নয়। পরে বিষয়টি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অবহিত করা হয়।
অন্যদিকে, জাহাজের শিপিং এজেন্ট চালের মান খারাপ হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, চালের রং কেবল ‘সামান্য লালচে’ ছিল, যা খাদ্য হিসেবে অনুপযোগী হওয়ার প্রমাণ নয়।
এদিকে বাংলাদেশের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারতের ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, চালের মান নিয়ে আপত্তি তোলার পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভারতীয় ব্যবসায়ী বলেন, বহু বছর ধরে তারা বাংলাদেশে চাল রপ্তানি করছেন। গত বছর বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি করলেও পরে বেশি দামের কারণে আবার ভারত থেকেই চাল কিনতে শুরু করে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি ‘রাজনৈতিক খেলা’।
আরেক ব্যবসায়ী দাবি করেন, এই ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে খাদ্য আমদানিতে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে তারা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘এমভি এইচটি পাইওনিয়ার’ জাহাজ থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩ হাজার ৫০০ টন চাল খালাস করা হয়েছে। বাকি প্রায় ৮ হাজার টন চাল খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং পুরো চালানটি ভারতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক দরপত্রের পর সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে এ চাল আমদানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। একজন ভারতীয় রপ্তানিকারক একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মজুত থেকে চাল সংগ্রহ করে বাংলাদেশে সরবরাহ করেছিলেন।
এদিকে ভারতীয় ব্যবসায়ী মহলের আরেকটি অংশের দাবি, শেখ হাসিনা সরকারের সময় খাদ্য অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তারকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণেও এ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, সেই দ্বন্দ্বের পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে ভারতীয় চালের এই চালানের ওপর।
ভারতের বাণিজ্যিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার টন অ-বাসমতি চাল রপ্তানি করেছে, যার অধিকাংশই ছিল সিদ্ধ চাল। এসব চালের রপ্তানি মূল্য ছিল প্রায় ৫৪ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এ রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৯ হাজার টন, যার মূল্য ছিল ৩৫ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ভারত ১ লাখ ৬০ হাজার টন চাল রপ্তানি করেছে, যার মূল্য প্রায় ৮১ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: