infoamaderdin@gmail.com সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে জামায়াত জোটে অস্বস্তি, শরিকদের ক্ষোভে বাড়ছে দূরত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৯ জুলাই ২০২৬ ১৬:০৭ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দূরত্ব বাড়ার পর উভয় দল পৃথক রাজনৈতিক জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ভেতরেই বিভিন্ন ইস্যুতে অসন্তোষ ও মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।

বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।

জোটসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, আসন বণ্টন, রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রদান এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কয়েকটি শরিক দলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আন্দোলনে শরিকদের সম্পৃক্ত রাখা হলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

ইতোমধ্যে খেলাফত আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে ১১ দলীয় জোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। দলটির দাবি, সংসদের উচ্চকক্ষে আসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তার কারণেই তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে খেলাফত মজলিসও বর্তমানে জোটের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে না। দলটির মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের জানিয়েছেন, সংসদে একসঙ্গে থাকলেও আপাতত জোটের কর্মসূচিতে তারা থাকছেন না। সময় হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক এনসিপির সঙ্গেও জামায়াতের বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দলের নেতাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে বিরোধ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংসদে ভূমিকা, সরকারের সমালোচনায় অবস্থান এবং স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের নীতিতেও অসন্তোষ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে এবি পার্টিও।

তবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) এবং লেবার পার্টি প্রকাশ্যে জামায়াতের অবস্থানের বিরোধিতা করেনি। যদিও এসব দলের সংসদে কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।

সংসদ নির্বাচনে জামায়াত শরিক দলগুলোর জন্য একাধিক আসন ছেড়ে দিলেও কয়েকটি আসনে একাধিক দলের প্রার্থী থাকায় জোটের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, কিছু আসন শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হলেও সেখানে জামায়াতের প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচন চালিয়ে যান। নির্বাচনে জামায়াত ৬৮টি আসনে জয় পায়। এছাড়া এনসিপি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত ২টি এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসনে বিজয়ী হয়।

এদিকে কওমি ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর হেফাজতে ইসলামের চাপও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা সম্প্রতি এক বৈঠকে কওমি ধারার দলগুলোকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। তাদের দাবি, কওমি মাদরাসায় জামায়াতের আদর্শিক প্রভাব বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে মাদরাসা শিক্ষার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী বলেছেন, সংগঠনটি রাজনৈতিক নয়; তারা কেবল কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছে।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। দলটির প্রার্থীরা ইতোমধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছেন। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী আগস্টে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে এবং অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জোটের শরিকদের অভিযোগ, স্থানীয় নির্বাচনেও সমন্বিতভাবে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা না করেই জামায়াত এককভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, অতীতেও বিএনপির সঙ্গে জোটে থেকেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে অংশ নিয়েছে। তার ভাষায়, জাতীয় নির্বাচনে জোটগত সমন্বয় থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নেওয়াই স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১১ দলীয় জোটের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ও সমন্বয়ের বিষয়টি আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে জামায়াত জোটে অস্বস্তি, শরিকদের ক্ষোভে বাড়ছে দূরত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই ২০২৬ ১৬:০৭ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দূরত্ব বাড়ার পর উভয় দল পৃথক রাজনৈতিক জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ভেতরেই বিভিন্ন ইস্যুতে অসন্তোষ ও মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।

বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।

জোটসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, আসন বণ্টন, রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রদান এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কয়েকটি শরিক দলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আন্দোলনে শরিকদের সম্পৃক্ত রাখা হলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

ইতোমধ্যে খেলাফত আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে ১১ দলীয় জোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। দলটির দাবি, সংসদের উচ্চকক্ষে আসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তার কারণেই তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে খেলাফত মজলিসও বর্তমানে জোটের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে না। দলটির মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের জানিয়েছেন, সংসদে একসঙ্গে থাকলেও আপাতত জোটের কর্মসূচিতে তারা থাকছেন না। সময় হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক এনসিপির সঙ্গেও জামায়াতের বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দলের নেতাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে বিরোধ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংসদে ভূমিকা, সরকারের সমালোচনায় অবস্থান এবং স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের নীতিতেও অসন্তোষ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে এবি পার্টিও।

তবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) এবং লেবার পার্টি প্রকাশ্যে জামায়াতের অবস্থানের বিরোধিতা করেনি। যদিও এসব দলের সংসদে কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।

সংসদ নির্বাচনে জামায়াত শরিক দলগুলোর জন্য একাধিক আসন ছেড়ে দিলেও কয়েকটি আসনে একাধিক দলের প্রার্থী থাকায় জোটের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, কিছু আসন শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হলেও সেখানে জামায়াতের প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচন চালিয়ে যান। নির্বাচনে জামায়াত ৬৮টি আসনে জয় পায়। এছাড়া এনসিপি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত ২টি এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসনে বিজয়ী হয়।

এদিকে কওমি ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর হেফাজতে ইসলামের চাপও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা সম্প্রতি এক বৈঠকে কওমি ধারার দলগুলোকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। তাদের দাবি, কওমি মাদরাসায় জামায়াতের আদর্শিক প্রভাব বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে মাদরাসা শিক্ষার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী বলেছেন, সংগঠনটি রাজনৈতিক নয়; তারা কেবল কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছে।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। দলটির প্রার্থীরা ইতোমধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছেন। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী আগস্টে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে এবং অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জোটের শরিকদের অভিযোগ, স্থানীয় নির্বাচনেও সমন্বিতভাবে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা না করেই জামায়াত এককভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, অতীতেও বিএনপির সঙ্গে জোটে থেকেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে অংশ নিয়েছে। তার ভাষায়, জাতীয় নির্বাচনে জোটগত সমন্বয় থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নেওয়াই স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১১ দলীয় জোটের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ও সমন্বয়ের বিষয়টি আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর