রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: বিএনপির চার নাম থেকে আলোচনায় এখন মির্জা ফখরুল
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। শুরুতে দলটির অন্তত চারজন নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও এখন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরেই আলোচনা সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আগামী ২০ আগস্ট দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। ১৬ আগস্ট শুরু হবে মনোনয়নপত্র বাছাই। আর ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করা যাবে। ফলে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন, তা আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হতে পারে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিষয়ে বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। তবে দলীয় সূত্রের ভাষ্য, দলের বাইরে কাউকে বেছে নেওয়ার পরিবর্তে বিএনপির মধ্য থেকেই একজন সক্রিয় ও অভিজ্ঞ রাজনীতিককে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।
মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খানের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। এর বাইরে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ আহমেদ বীর বিক্রমকে বহাল রাখার বিষয়েও রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সব দিক বিবেচনায় অন্যদের তুলনায় মির্জা ফখরুলই এগিয়ে আছেন।
কেন এগিয়ে মির্জা ফখরুল
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিএনপির বক্তব্য জনসমক্ষে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তুলনামূলক সংযত বক্তব্য এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতাকেও তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতার ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে আলোচনায় মির্জা ফখরুলই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সারা দেশে তাঁর গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে।
তবে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করা হলে বিএনপির মহাসচিব পদে পরিবর্তন আনতে হবে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু বঙ্গভবনে নতুন মুখ আনার বিষয় নয়, বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বেও এর প্রভাব পড়তে পারে। দলীয় নেতৃত্বের কাছে এটিও গুরুত্বপূর্ণ একটি সমীকরণ।
খন্দকার মোশাররফের সামনে অভিজ্ঞতার সমীকরণ
সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে। নতুন সরকারের শুরুতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজন হলে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে বলে মনে করছেন দলের কেউ কেউ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ মঈন খান
রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় থাকা ড. আবদুল মঈন খান বিএনপির আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে দলটির যোগাযোগে তাঁকে সক্রিয় দেখা গেছে।
রাষ্ট্রপতি পদে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য কাউকে বেছে নেওয়ার চিন্তা থাকলে মঈন খানের নাম গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে নতুন সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পর্ক আরও সক্রিয় করার প্রয়োজন হলে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে বলে দলের ভেতরে একটি মত রয়েছে।
শ্রমিক রাজনীতি থেকে উঠে আসা নজরুল ইসলাম খান
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নামও সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শ্রমিক আন্দোলন ও রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
দলের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক পরিচিতি এবং ত্যাগী নেতা হিসেবে তাঁর অবস্থান রয়েছে। তবে দলীয় সূত্রগুলোর মতে, অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তুলনায় রাষ্ট্রপতি পদে নজরুল ইসলাম খানের নাম কতটা জোরালোভাবে বিবেচিত হচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে বহাল রাখার গুঞ্জন
বিএনপির চার নেতার বাইরে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ আহমেদ বীর বিক্রমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল রাখার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। তাঁর পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের যুক্তি, এতে বর্তমান অবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং রাষ্ট্রপতি পদকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির প্রয়োজন হবে না।
তবে তাঁকে বহাল রাখার বিষয়টি এখন পর্যন্ত বিএনপির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। রাজনৈতিক মহলের আলোচনা ও সম্ভাব্য সমীকরণের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রয়েছে।
আলোচনায় অধ্যাপক ইউনূসও
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের বাইরে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে।
গত ৫ আগস্ট একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে ইউনূসকে বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি সামনে এনে কেউ কেউ ধারণা করছেন, ভবিষ্যতে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে দেখা যেতে পারে। তবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিএনপির নেতৃত্বেও সমীকরণ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে বিএনপির নেতারা শুধু সাংবিধানিক পদে একজনকে বসানোর বিষয় হিসেবে দেখছেন না। এর সঙ্গে দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বের বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব পদে নতুন কাউকে দায়িত্ব দিতে হবে। আবার স্থায়ী কমিটির অন্য কোনো নেতাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে দলের নীতিনির্ধারণী কাঠামোতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চললেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ২ আগস্ট রাতে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা এখন চারজন থেকে মূলত একজনকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। তবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হবে দলটি শেষ পর্যন্ত কাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: