infoamaderdin@gmail.com রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
১ ভাদ্র ১৪৩৩

তারেক রহমানের টেবিলে ছাত্রদলের নতুন কমিটি, ঘোষণা যেকোনো সময়

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৬ আগষ্ট ২০২৬ ১৮:০৮ পিএম

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, নতুন কমিটির একটি খসড়া বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে রয়েছে। তাঁর চূড়ান্ত অনুমোদনের পর যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।

তবে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে এখনো দলীয়ভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। গত শুক্রবার তিনি জানান, ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে তাঁর কাছে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসেনি।

এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে ছাত্রদলের বর্তমান শীর্ষ পাঁচ নেতার বিদায়ী সাক্ষাৎ নতুন কমিটি ঘোষণার জল্পনা আরও বাড়িয়েছে। সাক্ষাতের পর বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বিদায়ী বার্তা দেন। এতে সংগঠনটির বর্তমান নেতৃত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, বিদায়ী সাক্ষাতে সাম্প্রতিক আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের ভূমিকা, সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং বিদায়ী নেতাদের মূল দলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত কয়েক বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ছাত্রদলের ভূমিকার প্রশংসা করেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা নেতাদের পরবর্তী ধাপে নিয়ে গিয়ে নতুনদের নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিদায়ী নেতাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, বিগত সরকারের পতনে ছাত্রদল রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। তবে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী এখন নতুনদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন এবং বিদায়ী নেতাদের মূল দলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সময় এসেছে।

সাক্ষাতে বিদায়ী নেতারাও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা ও আনুগত্যের কথা জানান। ভবিষ্যতে দল যে দায়িত্ব দেবে, তা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।

দুই বছরের মেয়াদ শেষ, অপেক্ষা নতুন নেতৃত্বের

২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই সময়ে আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়াকে সিনিয়র সহসভাপতি, শ্যামল মালুমকে সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং আমান উল্লাহ আমানকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়।

এরপর ১৫ জুন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়।

ছাত্রদলের খসড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সংসদের মেয়াদ দুই বছর। সেই হিসাবে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর থেকেই নতুন কমিটির শীর্ষ পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা বাড়তে থাকে।

দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসা ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন দলটির সাংগঠনিক ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার যে আলোচনা রয়েছে, তার অংশ হিসেবেই ছাত্রদলের নতুন কমিটিকে দেখা হচ্ছে।

সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় একাধিক নাম

নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, যুগ্ম সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খানের নাম রয়েছে।

এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিক, যুগ্ম সম্পাদক রিয়াদ রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আরিফ, খোরশেদ আলম সোহেল, যুগ্ম সম্পাদক তরিকুল ইসলাম তারিক, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, রাজু আহমেদ, গাজী সাদ্দাম হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক পদমর্যাদায় প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ, মোস্তাফিজুর রহমান শুভ, সাফি ইসলাম ও নুর আলম ভূঁইয়া ইমনের নামও আলোচনায় রয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কারা দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নির্ভর করছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর।

সম্ভাব্য নেতৃত্বের অন্যতম আলোচিত নাম ইজাজুল কবির রুয়েল বলেন, নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে গেছে এবং যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে। হাইকমান্ড যে কাঠামোকে উপযুক্ত মনে করবে, সবাই সেই সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থাশীল বলেও জানান তিনি।

যুগ্ম সম্পাদক রিয়াদ রহমান বলেন, ভবিষ্যতের ছাত্র নেতৃত্বকে নৈতিক, শিক্ষার্থীবান্ধব ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণে কাজ করাই নতুন নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

মমিনুল ইসলাম জিসান বলেন, সহযোদ্ধাদের একটি অংশ তাঁকে নেতৃত্বে দেখতে চায়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের এবং তিনি সেই সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল।

ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছাত্রদল রাজপথের অগ্রভাগে থেকে ভূমিকা রেখেছে। এখন দেশ গঠনের ক্ষেত্রেও সংগঠন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে চায়। নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, ত্যাগী ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে বলে আশা করেন তিনি।

রাকিব-নাছিরের বিদায়ী বার্তায় নতুন ইঙ্গিত

নতুন কমিটি গঠনের আলোচনার মধ্যেই বিদায়ী সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট নেতাকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতের পর তিনি লেখেন, অনেক বেশি সম্মান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে। দায়িত্ব পালনে কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে নতুন রাজনৈতিক জীবনের জন্য সবার শুভকামনা চান তিনি।

কেন্দ্রীয় সংসদ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের নেতাদের নিয়েও গর্ব প্রকাশ করেন রাকিব। নানা আর্থিক ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নেতাকর্মীরা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ নিজ ইউনিটের নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এরপর বিদায়ী বার্তা দেন সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। দায়িত্ব পালনকালে কোনো ভুল বা অন্যায় হয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে তিনি জানান, দায়িত্ব থেকে বিদায় নিলেও ছাত্রদল থেকে বিদায় নিচ্ছেন না। ভবিষ্যতে অন্য কোনো দায়িত্বে আবারও কাজ করার প্রত্যাশার কথাও তাঁর বার্তায় উঠে আসে।

নতুন নেতৃত্বে তৃণমূলের প্রত্যাশা

ছাত্রদলের সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা, নিয়মিত শিক্ষার্থী হওয়া, নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে।

নেতাকর্মীদের একটি অংশের মতে, বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা নেতাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হলে সংগঠনের সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। অন্যদিকে আরেকটি অংশ মনে করছে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্রদলকে শুধু আন্দোলনমুখী সংগঠন হিসেবে নয়, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, অধিকার, নিরাপত্তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে আরও কার্যকর সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা

বর্তমান নেতৃত্বের বিদায়ী সাক্ষাৎ, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিদায়ী বার্তা এবং সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতায় ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার আবহ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কমিটির খসড়া এখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়।

তবে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি না আসা পর্যন্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কারা আসছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। শেষ মুহূর্তে আলোচনার বাইরে থাকা কোনো নেতাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

ফলে ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের এখন মূল কৌতূহল—রাকিব-নাছির পর্বের পর সংগঠনের হাল ধরছেন কারা। সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


তারেক রহমানের টেবিলে ছাত্রদলের নতুন কমিটি, ঘোষণা যেকোনো সময়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ আগষ্ট ২০২৬ ১৮:০৮ পিএম

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, নতুন কমিটির একটি খসড়া বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে রয়েছে। তাঁর চূড়ান্ত অনুমোদনের পর যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।

তবে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে এখনো দলীয়ভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। গত শুক্রবার তিনি জানান, ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে তাঁর কাছে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসেনি।

এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে ছাত্রদলের বর্তমান শীর্ষ পাঁচ নেতার বিদায়ী সাক্ষাৎ নতুন কমিটি ঘোষণার জল্পনা আরও বাড়িয়েছে। সাক্ষাতের পর বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বিদায়ী বার্তা দেন। এতে সংগঠনটির বর্তমান নেতৃত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, বিদায়ী সাক্ষাতে সাম্প্রতিক আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের ভূমিকা, সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং বিদায়ী নেতাদের মূল দলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত কয়েক বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ছাত্রদলের ভূমিকার প্রশংসা করেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা নেতাদের পরবর্তী ধাপে নিয়ে গিয়ে নতুনদের নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিদায়ী নেতাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, বিগত সরকারের পতনে ছাত্রদল রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। তবে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী এখন নতুনদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন এবং বিদায়ী নেতাদের মূল দলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সময় এসেছে।

সাক্ষাতে বিদায়ী নেতারাও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা ও আনুগত্যের কথা জানান। ভবিষ্যতে দল যে দায়িত্ব দেবে, তা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।

দুই বছরের মেয়াদ শেষ, অপেক্ষা নতুন নেতৃত্বের

২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই সময়ে আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়াকে সিনিয়র সহসভাপতি, শ্যামল মালুমকে সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং আমান উল্লাহ আমানকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়।

এরপর ১৫ জুন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়।

ছাত্রদলের খসড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সংসদের মেয়াদ দুই বছর। সেই হিসাবে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর থেকেই নতুন কমিটির শীর্ষ পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা বাড়তে থাকে।

দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসা ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন দলটির সাংগঠনিক ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার যে আলোচনা রয়েছে, তার অংশ হিসেবেই ছাত্রদলের নতুন কমিটিকে দেখা হচ্ছে।

সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় একাধিক নাম

নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, যুগ্ম সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খানের নাম রয়েছে।

এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিক, যুগ্ম সম্পাদক রিয়াদ রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আরিফ, খোরশেদ আলম সোহেল, যুগ্ম সম্পাদক তরিকুল ইসলাম তারিক, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, রাজু আহমেদ, গাজী সাদ্দাম হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক পদমর্যাদায় প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ, মোস্তাফিজুর রহমান শুভ, সাফি ইসলাম ও নুর আলম ভূঁইয়া ইমনের নামও আলোচনায় রয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কারা দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নির্ভর করছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর।

সম্ভাব্য নেতৃত্বের অন্যতম আলোচিত নাম ইজাজুল কবির রুয়েল বলেন, নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে গেছে এবং যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে। হাইকমান্ড যে কাঠামোকে উপযুক্ত মনে করবে, সবাই সেই সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থাশীল বলেও জানান তিনি।

যুগ্ম সম্পাদক রিয়াদ রহমান বলেন, ভবিষ্যতের ছাত্র নেতৃত্বকে নৈতিক, শিক্ষার্থীবান্ধব ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণে কাজ করাই নতুন নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

মমিনুল ইসলাম জিসান বলেন, সহযোদ্ধাদের একটি অংশ তাঁকে নেতৃত্বে দেখতে চায়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের এবং তিনি সেই সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল।

ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছাত্রদল রাজপথের অগ্রভাগে থেকে ভূমিকা রেখেছে। এখন দেশ গঠনের ক্ষেত্রেও সংগঠন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে চায়। নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, ত্যাগী ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে বলে আশা করেন তিনি।

রাকিব-নাছিরের বিদায়ী বার্তায় নতুন ইঙ্গিত

নতুন কমিটি গঠনের আলোচনার মধ্যেই বিদায়ী সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট নেতাকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতের পর তিনি লেখেন, অনেক বেশি সম্মান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে। দায়িত্ব পালনে কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে নতুন রাজনৈতিক জীবনের জন্য সবার শুভকামনা চান তিনি।

কেন্দ্রীয় সংসদ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের নেতাদের নিয়েও গর্ব প্রকাশ করেন রাকিব। নানা আর্থিক ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নেতাকর্মীরা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ নিজ ইউনিটের নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এরপর বিদায়ী বার্তা দেন সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। দায়িত্ব পালনকালে কোনো ভুল বা অন্যায় হয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে তিনি জানান, দায়িত্ব থেকে বিদায় নিলেও ছাত্রদল থেকে বিদায় নিচ্ছেন না। ভবিষ্যতে অন্য কোনো দায়িত্বে আবারও কাজ করার প্রত্যাশার কথাও তাঁর বার্তায় উঠে আসে।

নতুন নেতৃত্বে তৃণমূলের প্রত্যাশা

ছাত্রদলের সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা, নিয়মিত শিক্ষার্থী হওয়া, নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে।

নেতাকর্মীদের একটি অংশের মতে, বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা নেতাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হলে সংগঠনের সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। অন্যদিকে আরেকটি অংশ মনে করছে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্রদলকে শুধু আন্দোলনমুখী সংগঠন হিসেবে নয়, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, অধিকার, নিরাপত্তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে আরও কার্যকর সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা

বর্তমান নেতৃত্বের বিদায়ী সাক্ষাৎ, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিদায়ী বার্তা এবং সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতায় ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার আবহ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কমিটির খসড়া এখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়।

তবে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি না আসা পর্যন্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কারা আসছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। শেষ মুহূর্তে আলোচনার বাইরে থাকা কোনো নেতাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

ফলে ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের এখন মূল কৌতূহল—রাকিব-নাছির পর্বের পর সংগঠনের হাল ধরছেন কারা। সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর