শুধু বৃষ্টি নয়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী বন্যার পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক সংকট
দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদে চলমান দীর্ঘস্থায়ী বন্যার জন্য শুধু ভারী বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলই দায়ী নয়। নদী-খাল ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, পাহাড় কাটা, প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস, জোয়ারের প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ফলেই এ অঞ্চলে বন্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বান্দরবানের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হাঙ্গর খাল বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলের পানি বহন করে লোহাগাড়া ও সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে ডলু খালের মাধ্যমে সাঙ্গু নদীতে মিশে যাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে খালটির শেষাংশ পলি জমে ভরাট, দখল ও সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ায় পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারছে না। ফলে পাহাড়ি ঢলের বিপুল পানি লোকালয়ে আটকে গিয়ে প্রতি বছরই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়নের শেষ অংশে হাঙ্গর খাল প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। কোথাও এটি সরু নালায় পরিণত হয়েছে, কোথাও সম্পূর্ণ ভরাট। ফলে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ধারণ কিংবা দ্রুত নিষ্কাশনের সক্ষমতা হারিয়েছে খালটি।
একই পরিস্থিতি ডলু খালসহ সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীর অসংখ্য শাখা খালের। দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় এসব খালের নাব্যতা কমে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে অনেক স্থানে কৃষিকাজ হলেও বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের পানি বহন করতে ব্যর্থ হচ্ছে খালগুলো। এতে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
২০২৩ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় স্থানীয়রা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনকে দায়ী করলেও এবার রেললাইনবিহীন বাঁশখালীও ভয়াবহভাবে প্লাবিত হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রেললাইন একটি কারণ হলেও সেটিই একমাত্র কারণ নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিবেশগত অব্যবস্থাপনাই মূল সংকট সৃষ্টি করেছে।
সরেজমিনে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি ও গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে রয়েছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও বুকসমান পানি জমে আছে। অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া চলাচল সম্ভব হচ্ছে না। বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালীরা মাছের ঘের রক্ষার জন্য প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছেন। কোথাও স্লুইসগেট বন্ধ রাখা হয়েছে, কোথাও প্রাকৃতিক নিষ্কাশন পথ সংকুচিত করা হয়েছে। ফলে পাহাড়ি ঢলের পানি দীর্ঘ সময় ধরে লোকালয়ে আটকে থাকছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় সাঙ্গু, ডলু ও অন্যান্য নদীতে বিপুল পরিমাণ পলি জমেছে। এতে নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় অতিবৃষ্টির সময় দ্রুত পানি উপচে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় ধরে নেমে যেতে পারে না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মো. বরকত আলী বলেন, চট্টগ্রামে এবার রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টির সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের প্রভাব যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি নদী, খাল, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট, পাহাড় কাটা এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর মতে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনও বন্যার অন্যতম একটি কারণ হলেও একে ঘিরে পর্যাপ্ত পানি চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আবাসন, বাজার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনার জন্য অসংখ্য বিল, জলাভূমি ও নিচু জমি ভরাট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে শাখা খাল ও পাহাড়ি ছড়া। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে পৌঁছাতে না পেরে জনবসতিতে আটকে যাচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের অনেক নদী, খাল ও স্লুইসগেট আগের কার্যকারিতা হারিয়েছে। কোথাও পলি জমেছে, কোথাও অবৈধ দখল হয়েছে, আবার কোথাও দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েকটি খাল পুনঃখননের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও শাখা খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী, সাঙ্গু ও ডলুসহ সংশ্লিষ্ট নদীগুলোর নিয়মিত ড্রেজিং, বিলীন হয়ে যাওয়া খাল পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পাহাড় কাটা বন্ধ, জলাশয় সংরক্ষণ এবং রেল ও সড়ক অবকাঠামোয় পর্যাপ্ত কালভার্ট ও পানি চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: