লোডশেডিংয়ে থমকে ২০২৭ সালের বই ছাপা, বছরের প্রথম দিনে বই পাওয়া নিয়ে শঙ্কা
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লোডশেডিং। দিনে গড়ে মাত্র চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ায় ঢাকার বাইরের অনেক ছাপাখানায় ব্যাহত হচ্ছে মুদ্রণ কার্যক্রম।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই ছাপতে জেনারেটর চালিয়ে কাজ সচল রাখার চেষ্টা করলেও এতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। পাশাপাশি বারবার বিদ্যুৎ ও জেনারেটরের মধ্যে সংযোগ পরিবর্তনের কারণে নষ্ট হচ্ছে কাগজ ও ছাপার ফর্মা।
এ পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছে দেওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। সংকট সমাধানে ছাপাখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অথবা অন্তত নির্দিষ্ট সময়ে লোডশেডিং করার অনুরোধ জানিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভাগের হস্তক্ষেপ চেয়েছে সংস্থাটি।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ৩০ কোটির বেশি বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ শুরু হয়েছে গত ১৬ আগস্ট। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ শেষ করে বই উপজেলা পর্যায়ে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকার কার্যক্রম হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মুদ্রণকাজ শেষ করতে দিনরাত কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেই পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের প্রেসগুলোতে দিনে গড়ে চার ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ থাকছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে বিদ্যুৎ না থাকলে মেশিন বন্ধ রেখে কর্মীদের অলস বসে থাকতে হচ্ছে। আবার উৎপাদন চালু রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করলে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়।
চলতি বছর বিনামূল্যের বই ছাপার কাজ পেয়েছে ১৩৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই ঢাকার বাইরে। যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল ছাড়াও মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লায় বই ছাপার প্রেস রয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের মুদ্রণ কার্যক্রম অনেকটাই স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রেসগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে চিঠি দেন এনসিটিবির সচিব শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস। চিঠিতে কোনো এলাকায় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব না হলে অন্তত নির্দিষ্ট সময়ে লোডশেডিং করার অনুরোধ জানানো হয়। এতে লোডশেডিংয়ের সময় বাদ দিয়ে বাকি সময়ে প্রেসগুলো যাতে নিরবিচ্ছিন্নভাবে মেশিন চালাতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে এনসিটিবি।
চিঠিতে বলা হয়, নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বইয়ের মুদ্রণ শেষ করতে দিনরাত প্রেসগুলোতে কাজ চলছে। এ অবস্থায় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা জরুরি।
তবে এনসিটিবির অনুরোধের পরও লোডশেডিং পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে জানিয়েছেন বই ছাপার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রেস মালিকরা। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এতে একদিকে জ্বালানি খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বারবার মেশিন বন্ধ ও চালু করার কারণে কাগজ ও ছাপার ফর্মা নষ্ট হচ্ছে।
প্রেস মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি বড় ছাপাখানায় জেনারেটর চালিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ডিজেল বা তেলের পেছনে খরচ হচ্ছে। আবার টানা তিন থেকে চার ঘণ্টা জেনারেটর চলার পর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে সেটি ঠান্ডা করার জন্য এক থেকে দেড় ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়। ফলে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করেও নিরবচ্ছিন্নভাবে মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
এ ছাড়া মেশিন একবার বন্ধ করে পুনরায় চালু করলে গড়ে ১০ থেকে ১২ কেজি কাগজ নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মেশিন চালুর পর প্রথম দিকে অনেক ফর্মায় ছাপার মানও ঠিক থাকছে না। কখনো কখনো পুরো ফর্মা বাতিল করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির কারণে ছোট ও মাঝারি আকারের অনেক প্রেস বই ছাপার কাজ আপাতত বন্ধ রেখেছে বলেও জানা গেছে।
প্রমা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনসের মালিক মো. মহসিন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। দিনে গড়ে চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। জেনারেটর চালিয়ে ছাপার কাজ সচল রাখতে প্রতিদিন শুধু তেলের পেছনেই অতিরিক্ত ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। আবার জেনারেটর টানা তিন-চার ঘণ্টা চলার পর গরম হয়ে গেলে সেটি ঠান্ডা করার জন্য কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জেনারেটরের সংযোগে বারবার মেশিন বন্ধ ও চালু করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ কাগজ নষ্ট হচ্ছে। অনেক ফর্মাও বাতিল করতে হচ্ছে। ফলে একদিকে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে কাগজ ও ফর্মা নষ্ট হয়ে লোকসান বাড়ছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলাও স্বীকার করেছেন, লোডশেডিং বর্তমানে বই ছাপার কাজে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, প্রেসগুলো ঠিকমতো বই ছাপাতে পারছে না। এ কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানিগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ফোনেও প্রেস এলাকায় লোডশেডিং কমানো অথবা নির্দিষ্ট সময়ে, যেমন দুপুরে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভাগকে জানানো হবে। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে আরও উচ্চপর্যায়ে হস্তক্ষেপ চাওয়া হতে পারে। দ্রুত বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বইয়ের মুদ্রণ শেষ করা এবং বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার কর্মসূচি কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, লোডশেডিংয়ের বিষয়টি তারা শুনেছেন। এনসিটিবি থেকে বিষয়টি প্রস্তাব আকারে এলে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। প্রয়োজনে অন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার হলে সেটিও নেওয়া হবে।
ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বিদ্যুৎ সংকট কাটিয়ে নির্ধারিত ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৩০ কোটির বেশি বই ছাপার কাজ শেষ করা সম্ভব হবে কি না। কারণ মুদ্রণকাজে বিলম্ব হলে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বই পরিবহন ও উপজেলা পর্যায়ে বিতরণ কার্যক্রমে। এতে বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যের নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার সরকারের লক্ষ্যও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: