ডেঙ্গুতে আক্রান্তে পুরুষ এগিয়ে, মৃত্যুহারে নারীরা বেশি ঝুঁকিতে
দেশে ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৩২ হাজার ২৪৮ জন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৮৮ জনের মধ্যে ৫১ জনই নারী। অর্থাৎ আক্রান্তের সংখ্যায় পুরুষরা এগিয়ে থাকলেও ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকিতে নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ১৯ হাজার ৮০৯ জন পুরুষ এবং ১২ হাজার ২৪২ জন নারী। সে হিসাবে মোট আক্রান্তের প্রায় ৬১ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৯ শতাংশ নারী।
অন্যদিকে, ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে ৫১ জন নারী এবং ৩৭ জন পুরুষ। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় ৫৮ শতাংশ নারী এবং ৪২ শতাংশ পুরুষ। আক্রান্তের সংখ্যায় পুরুষ নারীদের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ এগিয়ে থাকলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীদের অংশ পুরুষের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি।
বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানেও উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের প্রায় ৬০ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এই বয়সী আক্রান্তদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ শতাংশ নারী। তবে একই বয়সসীমায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মৃতদের প্রায় ৬০ শতাংশ নারী এবং ৪০ শতাংশ পুরুষ।
চিকিৎসকদের মতে, নারীদের ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। চিকিৎসায় দেরি করা, রোগের উপসর্গকে গুরুত্ব না দেওয়া, শারীরিক স্থূলতা এবং হাসপাতালে পৌঁছাতে বিলম্বের কারণে অনেক রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ স্থূলতা। মানুষের ওজন যত বেশি হয়, ডেঙ্গুর তীব্রতা তার ক্ষেত্রে তত বেশি হতে পারে। বাংলাদেশের নারীদের একটি বয়সের পর শরীরে স্থূলতা ও ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। ফলে তাদের ডেঙ্গুর তীব্রতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর আশঙ্কাও বাড়াতে পারে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, দেশের নারীদের মধ্যে অনেক সময় রোগের লক্ষণ চেপে রাখার প্রবণতা রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চান না। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয় এবং ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম ও এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রোমের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা গেলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।
ডেঙ্গুর প্রকোপের দিক থেকে দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। চলতি বছর এ বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১২ হাজার ৭৪৫ জন, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৪০ শতাংশ। মৃত্যুর ক্ষেত্রেও ঢাকা বিভাগ শীর্ষে। এ বিভাগে মারা গেছেন ৪৫ জন, যা দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৫১ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ মৃত্যু ঘটেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায়। বাকি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা জেলা এবং বিভাগের অন্যান্য এলাকায়।
আক্রান্তের দিক থেকে ঢাকা বিভাগের পর রয়েছে বরিশাল বিভাগ। চলতি বছর এ বিভাগের ছয় জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৩৮৬ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৬ জন এবং খুলনা বিভাগে ৪ হাজার ৭৮০ জন। এ ছাড়া ময়মনসিংহে ১ হাজার ৬৬৮, রাজশাহীতে ১ হাজার ৬৬৮, রংপুরে ৮৩৬ এবং সিলেট বিভাগে ১৫৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
মৃত্যুর হিসাবে ঢাকা বিভাগের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা বিভাগ। এ বিভাগে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৬ জন। বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে আটজন করে, রাজশাহী বিভাগে চারজন এবং রংপুর ও সিলেট বিভাগে একজন করে মারা গেছেন।
জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে ডেঙ্গু সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জুলাই মাসে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৯ হাজার ২০৬ জন। অথচ আগস্টের প্রথম ২৭ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৯৩৮ জনে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে।
তবে সংক্রমণ বাড়লেও মৃত্যুর সংখ্যা একই হারে বাড়েনি। জুলাই মাসে ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলেন ৩৬ জন। আগস্টের প্রথম ২৭ দিনে মারা গেছেন ৩৪ জন।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায়ও চলতি বছর আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর সংখ্যা কম। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ২৯ হাজার ৯৪৪ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ১১৮ জন। চলতি বছরের একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৩২ হাজার ২৪৮ জন হলেও মৃত্যু কমে দাঁড়িয়েছে ৮৮ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশ এখনো ডেঙ্গুর পিক সিজনে প্রবেশ করেছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি হতে পারে। নভেম্বরের শেষ দিকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, এবার ঢাকার পাশাপাশি বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলেও ডেঙ্গুর দাপট বেশি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জ্বর হলেই রোগীরা যাতে দ্রুত পরীক্ষা করাতে পারেন, সে জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকায় জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বা দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে উপসর্গকে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: