ব্রহ্মপুত্রের পেটে খোদাবক্সপুর, বাড়ি হারানোর আতঙ্কে শত শত পরিবার
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভাঙনামারী ইউনিয়নের খোদাবক্সপুর গ্রামে এখন নদীর শব্দ মানেই আতঙ্ক। কখন ভিটেমাটি সরে যাবে, কখন ঘরবাড়ি নিয়ে ব্রহ্মপুত্রের স্রোতে হারিয়ে যাবে শেষ সম্বল—এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত দুই বছরে খোদাবক্সপুরে প্রায় দেড়শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। চলতি বছরও অন্তত ১৫ থেকে ২০টি পরিবার বাড়িঘর সরিয়ে নিয়েছে। ভাঙতে ভাঙতে গ্রামের প্রায় অর্ধেক এলাকা এখন ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে চলে গেছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
সম্প্রতি সরেজমিনে খোদাবক্সপুরে গিয়ে দেখা যায়, নদীর তীর ঘেঁষা বাড়িগুলোতে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। কোনো বাড়ির উঠান থেকে নদী মাত্র কয়েক হাত দূরে। কোথাও আবার ঘরের একেবারে কাছেই দেখা দিয়েছে ভাঙনের ক্ষত। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো ঘরের টিন, আসবাবপত্র, চাল-ডালসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে।
অনেকে আর অপেক্ষা না করে নদের ওপারে জেগে ওঠা চরে নতুন করে ঘর তুলেছেন। এক জীবনে বারবার ভিটেমাটি হারিয়ে আবার ঘর তোলার এই বাস্তবতাই যেন খোদাবক্সপুরের মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মান্নানের বাড়ি এবার নিয়ে পঞ্চমবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে তার বাড়ির দুটি ঘর নদে বিলীন হয়েছে। একসময় ২০ একর জমির মালিক ছিলেন তিনি। নদী কেড়ে নিয়েছে সেই জমিও।
কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবদুল মান্নান বলেন, ‘২০ একর জমিন ছিল, সবই শেষ। বাড়ি আর কত ভাঙব, আর কতবার বানবাম? ১৯৮৮ সালের পর থেইকা আমরার এলাকা ভাঙতাছে।’
একজন মানুষের জীবনে পাঁচবার বাড়ি ভাঙার অর্থ শুধু ঘর হারানো নয়। প্রতিবার নদী কেড়ে নেয় পরিচিত উঠান, গাছপালা, জমি ও স্মৃতিতে ঘেরা বসতভিটা। আবদুল মান্নানের দুই ছেলের বাড়িও নদে বিলীন হয়েছে। তারা এখন নদের ওপারের চরে নতুন করে বসতি গড়েছেন।
সোহেল রানার পরিবারের অবস্থাও একই। এর আগে তিনবার তাদের বাড়ি নদে ভেঙেছে। এবার ভিটায় থাকা আটটি ঘরই ভাঙনের ঝুঁকিতে। এরই মধ্যে তাদের ৩০ থেকে ৩৫ কাঠা কৃষিজমি নদে বিলীন হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন কিছুটা ঠেকানো গেলেও এতে স্থায়ী সমাধান হবে না। খোদাবক্সপুরকে রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে একের পর এক পরিবারকে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ বলেন, গৌরীপুরের খোদাবক্সপুর, ঈশ্বরগঞ্জের মরিচারচরসহ সদর উপজেলার কয়েকটি এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রায় ২৭০ মিটার এলাকায় জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ চলছে। খোদাবক্সপুর ও মরিচারচরেও জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে এসব কাজ শেষ করার আশা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, ভাঙনকবলিত এলাকায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে। খোদাবক্সপুরে ব্লক দিয়ে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা করা হচ্ছে। কয়েকটি পরিবারকে শুকনো খাবার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণের জন্য পাউবোর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, নদীভাঙনের অন্যতম কারণ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। গত তিন মাসে দুটি অভিযানে ৪৭টি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের পাশাপাশি নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে।
তবে প্রশাসনিক উদ্যোগের পরও খোদাবক্সপুরের মানুষের আতঙ্ক কাটছে না। তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন থেমে থাকে না। আজ যে ভিটায় দাঁড়িয়ে একটি পরিবার বসবাস করছে, কাল সেটিই নদীর স্রোতে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
আবদুল মান্নানের প্রশ্নই যেন এখন পুরো খোদাবক্সপুরের মানুষের প্রশ্ন—‘বাড়ি আর কত ভাঙব, আর কতবার বানবাম?’ নদীভাঙনে সর্বস্ব হারাতে থাকা এসব মানুষের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি স্থায়ী বাঁধ নয়; এটি তাদের ভবিষ্যৎ, বসতভিটা ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: