বকশীগঞ্জের স্থলবন্দরে দীর্ঘ অচলাবস্থা, রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি কর্মহীন ৮ হাজার শ্রমজীবী মানুষ
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ঈদুল আজহার ছুটির পর থেকে টানা প্রায় তিন মাস ধরে বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
এতে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন বন্দরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ৮ হাজার শ্রমজীবী মানুষ ও ব্যবসায়ী।
ব্যবসায়ী ও কাস্টমস সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিভিন্ন সময়েও ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও দীর্ঘ সময় ধরে আমদানির কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়নি। বিশেষ করে পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় বন্দরের সামগ্রিক কর্মচাঞ্চল্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত থেকে আমদানি করা পাথরের সঙ্গে আসা মাটি ও ধুলাবালির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ, বাড়তি পোর্ট চার্জ, ভারতের মেঘালয় অংশের সড়কের বেহাল অবস্থা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতার কারণে পাথর আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে। ফলে পাথর আমদানি করে লোকসানের আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা আপাতত আমদানি কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন।
সরেজমিনে ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, বন্দর প্রাঙ্গণে আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য নেই। বিভিন্ন স্থানে পড়ে রয়েছে পাথর ভাঙার শত শত ক্রাশার মেশিন। পাথরবাহী ট্রাকের আনাগোনাও নেই বললেই চলে। লোড-আনলোড শ্রমিক, গাড়িচালক, ক্রাশার মেশিনের কারিগরসহ বন্দরের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কাজ হারিয়ে বসে আছেন।
বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় স্থানীয় হোটেল, চায়ের দোকান, ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘদিন আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিক সংসারের খরচ মেটাতে ধারদেনা করছেন। কেউ কেউ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে পরিবার চালাচ্ছেন।
পাথর ভাঙার শ্রমিক খোকন মিয়া বলেন, “অনেক দিন ধরে কাজ নেই। আয় না থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কিস্তি দিতে পারছি না, বাজার-সদাই করতেও সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত পাথর আমদানি শুরু না হলে পরিবার নিয়ে আরও কষ্টে পড়তে হবে।”
ধানুয়া কামালপুর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য বিকাশ দত্ত বলেন, পাথরের সঙ্গে আসা মাটি ও ধুলাবালির জন্য আলাদা শুল্ক দিতে হলে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়ে। এর সঙ্গে ভারতের সড়ক যোগাযোগের সমস্যাও রয়েছে। এসব জটিলতা দূর করা না হলে ব্যবসায়ীদের পুনরায় আমদানিতে ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৪ সালে ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন হিসেবে ধানুয়া কামালপুরের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০১৫ সালে এটিকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর ঘোষণা করা হয়। বন্দরটির ইমিগ্রেশন ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া এই বন্দর দিয়ে ৩৪টি পণ্য আমদানির অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে বন্দরটি মূলত পাথর আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
ফলে পাথর আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বন্দরের অবকাঠামো থাকলেও তার সুফল মিলছে না। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, পাথর আমদানি চালু হলে শুধু বন্দরের শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরাই উপকৃত হবেন না; পরিবহন, হোটেল, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য খাতেও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে। তাই শুল্ক জটিলতা নিরসন, পোর্ট চার্জ পুনর্বিবেচনা এবং ভারতের অংশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে দ্রুত আমদানি কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন আকন্দ বলেন, “ভারতের অংশে সড়ক সংস্কারের কাজ চলায় এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের লোকসানের আশঙ্কার কারণে বর্তমানে আমদানি বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কাস্টমস বিভাগের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে এবং পুনরায় বন্দরে পণ্য আমদানি শুরু হবে।
দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বন্দরের ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, দ্রুত বিদ্যমান জটিলতার সমাধান করে ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরের আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হবে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: