বিশেষ টিকাদানেও কমছে না হাম, আড়াই মাসে ৮২৫ শিশুর মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ
দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষ এমআর (মিজলস-রুবেলা) টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মে থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৮২৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ফলে টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় বিশেষ এমআর টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ৮ এপ্রিল চারটি সিটি করপোরেশন এবং ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজারের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ।
তবে একই বয়সী শিশুদের জন্য গত ২৮ জুন পরিচালিত জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ শিশু। অর্থাৎ দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রায় ৪৬ লাখ শিশুর ব্যবধান রয়েছে। সেই হিসাবে বিশেষ হামের টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এসেছে প্রকৃত শিশু সংখ্যার প্রায় ৮১ শতাংশ। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার মূলত টিকাদান কর্মসূচির ওপর নির্ভর করলেও রোগী দ্রুত শনাক্তকরণ, আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিবিড় নজরদারির মতো গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপে ঘাটতি ছিল। এর ফলে টিকা কার্যক্রম চললেও সংক্রমণের শৃঙ্খল পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি।
বাস্তব চিত্রও উদ্বেগজনক। রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়া তিন বছর দুই মাস বয়সী শিশু আরাফাত সাজিদ নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচির দুই ডোজ এমআর টিকা নেওয়ার পাশাপাশি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতেও টিকা পেয়েছিল। এরপরও গত ১৯ জুলাই সে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তার মা সুমি আক্তার জানান, সময়মতো সব টিকা নেওয়া এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরও সন্তান কীভাবে হামে আক্রান্ত হলো, তা তাদের কাছে রহস্যই থেকে গেছে।
একই হাসপাতালে গত ২৪ জুলাই হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ১০ মাস বয়সী হাফসা। তার বাবা মামুন আহমেদ জানান, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতেও মেয়েকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। পরে জ্বর, কাশি ও শরীরে র্যাশ দেখা দিলে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকায় আনার পর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
তবে ইপিআই ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া ৩৩৭ শিশুর মধ্যে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো এমআর টিকা নেয়নি। মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এক ডোজ এবং ২ দশমিক ১ শতাংশ দুই বা তার বেশি ডোজ টিকা নিয়েছিল। এছাড়া ২৪ শতাংশ শিশুর বয়সই টিকা নেওয়ার উপযোগী হয়নি। হাসপাতালভিত্তিক তথ্যেও দেখা যায়, হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৬৬ হাজার ৬৯০ রোগীর প্রায় ৭৯ শতাংশ কোনো এমআর টিকা নেয়নি। নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ১৪ হাজার ৮৪৯ রোগীর ৮০ শতাংশই টিকাবঞ্চিত ছিল।
হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ে জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হাম মোকাবিলায় শুধু টিকাদানের ওপর নির্ভর না করে শুরু থেকেই কোভিড-১৯ মহামারির মতো জনস্বাস্থ্যভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল। আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া, প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো কার্যকর পদক্ষেপ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ২৪ শতাংশের বয়স ছয় মাসের নিচে এবং ৫২ শতাংশের বয়স এক বছরের কম। অপুষ্টি, মাতৃদুগ্ধের অভাব, ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতার কারণে টিকা নেওয়ার আগেই অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিকাদানের পাশাপাশি সমন্বিত জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। সাধারণত এমআর টিকা নেওয়ার তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে সেই প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে কোনো জাতীয় মূল্যায়ন হয়নি। টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী বলেন, সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় রক্ত পরীক্ষা করে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে পুনরায় টিকা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এবার সরকারের টিকাদান পরিকল্পনায় প্রকৃত শিশু সংখ্যা নির্ধারণে ঘাটতি ছিল। পাশাপাশি ৫ বছরের বেশি বয়সী অনেক শিশুও হামে আক্রান্ত হয়েছে। তাই বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি অন্তত ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি বিবেচনা করা যেতে পারে।
এদিকে ইপিআইয়ের উপপরিচালক হাসানুল মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং টিকাদান কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে। যেসব শিশু এখনো টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত নিকটস্থ টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক অভিভাবক এখনো বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। সব অভিভাবক সহযোগিতা করলে টিকার বাইরে থাকা শিশুদেরও দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধু টিকাদান নয়, বরং রোগী শনাক্তকরণ, আইসোলেশন, জনসচেতনতা, হাসপাতাল প্রস্তুতি এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কৌশল বাস্তবায়ন করা না হলে দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: