চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ-গ্যাসের তীব্র সংকট, গাড়ির চাকা থেমে চুলায় আগুন নেই
চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় নগরের সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। অনেক গণপরিবহন গ্যাসের অভাবে গ্যারেজে পড়ে থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
অন্যদিকে বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ না থাকায় রান্না ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। চালকদের অনেকেই ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু সরবরাহের চাপ কম থাকায় অনেক সময় পাম্প চালু করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
কর্ণফুলী প্রাকৃতিক গ্যাস লিমিটেডের আশপাশে সকাল ৬টা থেকে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ মঞ্জুর বলেন, ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়িতে গ্যাস নিতে পারেননি। অল্প গ্যাস থাকার পর চাপ একেবারেই কমে যাওয়ায় পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। এতে পুরো দিনের আয় নষ্ট হচ্ছে বলে জানান তিনি।
নগরের কোতোয়ালি, জিইসি মোড় ও কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেকসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। স্টেশন মালিকদের ভাষ্য, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। চাপ কিছুটা বাড়লে পাম্প চালু করা হচ্ছে, আবার কমে গেলে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
গ্যাস সংকটে গণপরিবহন কমে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যাচ্ছে না। আর যে কয়েকটি যানবাহন পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর চালকেরা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন।
এক যাত্রী জানান, স্বাভাবিক সময়ে বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ যেতে সিএনজি অটোরিকশায় ১০০ থেকে ১২০ টাকা ভাড়া লাগলেও বর্তমানে চালকেরা ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করছেন। গ্যাস সংকটের কারণে সাধারণ যাত্রীরা একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চালকদের দাবি, বাড়তি ভাড়া নেওয়ার পেছনে মূল কারণ গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা। ৩ নম্বর রুটের মিনিবাস চালক মো. হেলাল উদ্দীন বলেন, একটি ট্রিপ দেওয়ার আগে সাত থেকে আট ঘণ্টা পাম্পে বসে থাকতে হচ্ছে। এ সময়ে স্বাভাবিকভাবে তিন থেকে চারটি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হতো। ফলে আয় কমে যাওয়ায় তাঁদেরও সংসার চালাতে সমস্যা হচ্ছে।
গ্যাসের সংকট শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। বাসাবাড়িতেও রান্নার চুলায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় কখনো চুলা জ্বলছে দুর্বলভাবে, আবার কখনো একেবারেই গ্যাস থাকছে না। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার এলপিজি সিলিন্ডার বা বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে।
আকবরশাহ এলাকার বাসিন্দা আয়শা আক্তার বলেন, সকালে রান্নার সময় চুলার আগুন নিভু নিভু করে জ্বলে। কখনো একেবারেই গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বিকল্প উপায়ে রান্না করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
মুরাদপুরের গৃহিণী কুলসুম আক্তার জানান, গ্যাস না থাকায় বাড়তি টাকা খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের মধ্যে এই অতিরিক্ত ব্যয় সংসারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
গ্যাস সংকটের বড় ধাক্কা লেগেছে চট্টগ্রামের শিল্পখাতেও। রড উৎপাদন, পোশাক, জাহাজ ভাঙা ও স্টিল স্ট্রাকচারসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কিছু কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিএসআরএমের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর তপন সেনগুপ্ত বলেন, প্রায় ২০ দিন ধরে তাঁরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গ্যাস পাচ্ছেন না। গ্যাসের সংকট এতটাই তীব্র যে কারখানা পুরো সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার ৮০ শতাংশও পূরণ করা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। রাউজান ও আনোয়ারা এলাকার একাধিক ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট বন্ধ রয়েছে। ২২৫ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে চট্টগ্রামজুড়ে বিদ্যুতের ঘাটতি ও লোডশেডিং বেড়েছে।
চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) উৎপাদন বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার উত্তম চৌধুরী জানান, গ্যাস সংকটের কারণে সরকারি নির্দেশনায় গত ৪ মার্চ থেকে প্রায় পাঁচ মাস ধরে কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, তা দিয়ে কারখানা চালু রাখা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে দেশের কৃষি খাতে সার সরবরাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
চট্টগ্রামের বর্তমান গ্যাস সংকটের পেছনে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলোর সরবরাহ ব্যাহত হওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের গ্যাসের বড় একটি অংশ বঙ্গোপসাগরের মহেশখালীতে থাকা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ করা হয়।
গত ২১ জুলাই মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। পরে দেশি-বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিক সচল হলেও গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
এর মধ্যে বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ের কারণে এলএনজিবাহী নতুন কার্গো জাহাজ টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন জানান, উত্তাল সাগরের কারণে আমদানি করা এলএনজিবাহী জাহাজ পাইপলাইনের সঙ্গে সংযুক্ত করা যাচ্ছে না। এতে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অন্তত ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ কমেছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধানও সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে দৈনিক গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ পাওয়া যেত প্রায় ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সাম্প্রতিক সংকটে সরবরাহ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ উত্তর) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, বরাদ্দ কমে যাওয়ায় বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সংযোগ সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ না বাড়লে নগরের সংকট পুরোপুরি দূর করা কঠিন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাগরের আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়া এবং এলএনজি খালাস ও সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম। ফলে একদিকে পরিবহন ও রান্নাঘরে জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং—সব মিলিয়ে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের মধ্যে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: