ডেমরায় বোমা উদ্ধার
নেপথ্যে ‘বোমারু মামুন’, কারাগারেই নেটওয়ার্ক গড়ার অভিযোগ
রাজধানীর ডেমরায় দুটি বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির তৎপরতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে নব্য জেএমবির একটি সক্রিয় নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
এই নেটওয়ার্কের নেপথ্যে নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’ রয়েছেন বলেও তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর ডেমরার সানারপাড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. জুয়েল ভূঁইয়া (২৬) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার কাছ থেকে কালো কচটেপে মোড়ানো প্রায় ছয় ইঞ্চি লম্বা দুটি বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে সিটিটিসির বোমা ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে বস্তু দুটি নিষ্ক্রিয় করে। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও একজনকে আটক করা হয়।
ডিএমপির ডেমরা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মীর মুহসীন মাসুদ রানা জানান, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ও অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) যৌথভাবে অভিযানটি পরিচালনা করে। সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে জুয়েলকে তল্লাশি করা হলে তার কাছ থেকে বোমাসদৃশ বস্তু দুটি উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুয়েল উগ্রবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী এবং নব্য জেএমবির সামরিক শাখার সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সংগঠনের ভেতরে তিনি ‘ওস্তাদ’ নামে পরিচিত বলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
কারাগার থেকেই নেটওয়ার্ক তৈরির অভিযোগ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে দাবি করা হয়েছে, ‘বোমারু মামুন’ ও জুয়েলের মধ্যে আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল। জুয়েল ২০২৩ সালে এটিইউর একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে পাঠানো হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কাশিমপুর কারাগারে থাকা অবস্থায় জুয়েলের সঙ্গে বোমারু মামুনসহ নব্য জেএমবির কয়েকজন সদস্যের যোগাযোগ তৈরি হয়। সেখান থেকেই কারাগারের বাইরে সংগঠনের কার্যক্রম পুনর্গঠন ও নতুন সদস্যদের সংগঠিত করার পরিকল্পনা করা হয় বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মামুন, জুয়েলসহ চক্রটির কয়েকজন সদস্য জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর তারা বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সংগঠনের কার্যক্রম বিস্তারের চেষ্টা করেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সাভারে গোপন আস্তানার সন্ধান
সাম্প্রতিক সময়ে মতিঝিল ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার এবং রহস্যজনক বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে সাভারে একটি গোপন আস্তানার সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে সিটিটিসি।
গত ১১ আগস্ট রাতে সাভারের তেঁতুলঝড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান নামে নব্য জেএমবির এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই বাসায় তল্লাশি চালিয়ে বিস্ফোরকসদৃশ বিভিন্ন আলামত, ডেটোনেটর, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম এবং বোমা তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ উদ্ধার করা হয়।
সিটিটিসির এডিসি (ইনভেস্টিগেশন) মাঈন উদ্দীন চৌধুরীর বরাত দিয়ে জানা গেছে, আরিফ ২০২৩ সালে নব্য জেএমবির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠনটিতে যুক্ত হন। তদন্তে বোমারু মামুনকে তার মেন্টর বা মূল প্রভাবক হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তকারীদের দাবি, সাভারের ওই বাসাটি ব্যবহার করে নব্য জেএমবির জন্য একটি গোপন বোমা তৈরির কেন্দ্র গড়ে তোলার চেষ্টা চলছিল। সেখানে বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণের সঙ্গেও যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নব্য জেএমবির এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে কেরানীগঞ্জের একটি মাদরাসাকেন্দ্রিক তৎপরতার যোগসূত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, কেরানীগঞ্জের উম্মুল কুরা মাদরাসার পরিচালক শেখ আল আমিনের সঙ্গে বোমারু মামুনের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ওই মাদরাসায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তদন্তের পর আল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তার সঙ্গে মামুনসহ অন্যদের যোগাযোগের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বোমারু মামুনকে ঘিরে পুরোনো মামলাও সামনে
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, নাজমুল হাসান মামুন দীর্ঘ সময় ধরে জঙ্গিবাদসংক্রান্ত মামলায় কারাগারে ছিলেন। ২০১৭ সালে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিওতে বিস্ফোরণের ঘটনাতেও তার নাম মামলার আসামি হিসেবে এসেছিল।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ওই বিস্ফোরণ মামলায় মামুনসহ নয়জনকে আদালত খালাস দেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনায় তার নাম আবারও তদন্তে সামনে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, কারাগার থেকে মুক্তির পর মামুন আত্মগোপনে থেকে নব্য জেএমবির একটি নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
রাজধানীতে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ
এদিকে ঢাকায় ধারাবাহিকভাবে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার ও উগ্রবাদী তৎপরতার আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। গত ১৩ আগস্ট রাজারবাগে অনুষ্ঠিত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সভায় রাজধানীর বাসাবাড়ি, হোটেল, মেস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, টহল এবং সন্দেহজনক তৎপরতার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সিটিটিসি, এটিইউ ও ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিট পলাতক সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ করছে। বিশেষ করে বোমারু মামুন ও তার সহযোগীদের অবস্থান শনাক্তে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাম্প্রতিক সব বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনার সঙ্গে একই নেটওয়ার্কের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং উদ্ধার হওয়া আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্কের বিষয়ে আরও তথ্য বের করার চেষ্টা চলছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: