গ্যাস সংকটে নরসিংদীতে শিল্প বিপর্যয়, বন্ধ ৩ শতাধিক কারখানা
তীব্র গ্যাস সংকটে নরসিংদীর ছোট-বড় তিন শতাধিক শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে শ্রমিকেরা কর্মহীন হয়ে কারখানায় বসে আছেন। অন্যদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শিল্পমালিকেরা।
শিল্পমালিকেরা জানিয়েছেন, বর্তমান সংকটের আগেও নরসিংদীতে ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ কমছিল। কম চাপের মধ্যেও পালাক্রমে কারখানা চালিয়ে কোনোভাবে উৎপাদন অব্যাহত রাখা হচ্ছিল। তবে গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। কোনো কোনো সময় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসছে।
সীমিত গ্যাস সরবরাহ ও বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে গত প্রায় এক মাস কারখানাগুলো মাত্র ১০ শতাংশের মতো উৎপাদন ধরে রাখতে পেরেছিল। তবে গত দুই দিনে জেলার শতাধিক কারখানায় পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কবে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে শিল্পমালিকদের মধ্যে।
নরসিংদী শহর ও আশপাশে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার মধ্যে রয়েছে চিশতিয়া সাইজিং মিল, ইয়ামিন সাইজিং মিল, মোমিন সাইজিং মিল, হোসাইন ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং মিল, আবেদ টেক্সটাইল মিলস, শিল্পী ডাইং, নদী-বাংলা সাইজিং মিল, ভূইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস, আনোয়ার প্রিনটেক্স, রংধনু সাইজিং মিল, এন আহমেদ ডাইং ও নাসির ডাইং।
এ ছাড়া মাধবদীতে আমানত শাহ গ্রুপ ও পাকিজা গ্রুপের কয়েকটি কারখানাও গ্যাস সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। একই কারণে এমএমকে ডাইং, মুক্তাদিন ডাইং, মাধবদী ডাইং, মুক্তা ডাইং ও সখিনা ডাইংসহ আরও কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
গ্যাস সংকট নিয়ে শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে শিল্পকারখানাগুলোতে প্রায় ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস সরবরাহ করার কথা। কিন্তু কিছুদিন ধরে চাপ ২ থেকে ৪ পিএসআইয়ে নেমে এসেছিল। গত কয়েক দিনে তা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি চলে গেছে। ফলে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
নরসিংদী টেক্সটাইল, ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং মাধবদী ডাইং ফিনিশিং মিলসের মালিক নিজাম উদ্দিন ভূইয়া বলেন, নরসিংদী দেশের কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ করে। গ্যাস সংকটের কারণে জেলার অনেক মিল ও কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শিল্পমালিকেরা শ্রমিকদের বেতন দেওয়াই নয়, গ্যাসের বিল পরিশোধ করতেও সমস্যায় পড়বেন।
নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রাশেদুল হাসান রিন্টু বলেন, ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু হওয়ায় গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এত দিন সার কারখানাটি প্রায় ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছিল। সার আমদানি কমিয়ে দেশে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এখন এটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো হচ্ছে।
রাশেদুল হাসান রিন্টুর দাবি, এর ফলে শিল্পকারখানার জন্য বরাদ্দ গ্যাসের একটি অংশ সার কারখানায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে নরসিংদীর শিল্প উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না।
ভূইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস লিমিটেডের পরিচালক আনিসুর রহমান ভূইয়া দ্রুত সংকট সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারকে শিল্পমালিকদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—এই সংকট কবে সমাধান হবে এবং তত দিন কারখানাগুলো কীভাবে পরিচালনা করতে হবে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র ও নরসিংদী আবেদ টেক্সটাইল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তাঁদের কারখানায় গত ২৫ দিন ধরে পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ।
তিনি বলেন, শ্রমিকেরা কারখানায় বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন। তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি না হয়, সে জন্য রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ দেওয়া হচ্ছে। তবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকের সুদ ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করতে মালিকদের হিমশিম খেতে হবে।
এতে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হয়ে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
নরসিংদীতে তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক বিপণন কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মাকসুদ রহমান বলেন, এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে নরসিংদী ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তিনি বলেন, এর প্রভাবে উৎপাদনমুখী শিল্পের পাশাপাশি বাসাবাড়ি ও পরিবহন খাতও গ্যাস সংকটে পড়েছে। যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। নরসিংদী জেলা সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং এমএমকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মালিক আবদুল মোমেন মোল্লা বলেন, সাধারণত সিএনজি স্টেশনগুলোতে ১২ থেকে ১৫ পিএসআই চাপে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি কোনো কোনো দিন চাপ ০ থেকে ২ পিএসআইয়ে নেমে এসেছে।
নরসিংদীর শিল্প খাতে গ্যাস সংকট বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, জেলায় ১ লাখ ৯১ হাজার ২৭৫টি অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৬ লাখ ৫১ হাজার ৬৭৭ মানুষ। জেলায় কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি ও বৃহৎ—সব ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ফলে গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হলে শুধু শিল্প উৎপাদন নয়, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: