infoamaderdin@gmail.com শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
৭ ভাদ্র ১৪৩৩

গুলিস্তানে নানা অজুহাতে অতিরিক্ত চাঁদা আদায়, নীরব জিম্মি হাজারো ব্যবসায়ী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২২ আগষ্ট ২০২৬ ১৯:০৮ পিএম

ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র গুলিস্তান। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে সরগরম থাকে এখানকার মার্কেটগুলো। এসব মার্কেটকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজারো ব্যবসায়ী ও কর্মচারী। তবে ব্যবসার পাশাপাশি নানা অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে উদ্বেগ ও চাপের মধ্যে রয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দোকানের সামনের জায়গা ব্যবহার, নিরাপত্তা, মার্কেট ব্যবস্থাপনা কিংবা বিভিন্ন সুবিধার নামে নিয়মিত অর্থ দাবি করা হয়। নির্দিষ্ট সময় পরপর এসব অর্থ আদায় করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই দেওয়া হয় না কোনো রসিদ। ফলে আদায়কৃত অর্থের বৈধতা, হিসাব ও শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব অর্থ আদায়ের নেপথ্যে কথিত একটি ‘দরবেশ চক্র’ সক্রিয় রয়েছে। তাদের দাবি, চক্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন মামলা রয়েছে। এমনকি তাদের মধ্যে বিএনপি নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী আলমের গুম মামলার আসামিও রয়েছেন বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগের সরকারের সময় যারা বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সরকার পরিবর্তনের পরও তাদের প্রভাব পুরোপুরি কমেনি। বরং পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে তারা নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।

তবে প্রকাশ্যে নাম বলতে চান না অধিকাংশ ব্যবসায়ী। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগকারীর পরিচয় প্রকাশ হলে ব্যবসার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন তারা।

এক ব্যবসায়ী বলেন, ব্যবসা পরিচালনার স্বাভাবিক খরচের বাইরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে টাকা দিতে হয়। না দিলে সমস্যা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেকে প্রতিবাদ করেন না।

আরেক ব্যবসায়ী প্রশ্ন তোলেন, নিয়মিত অর্থ আদায় হলে এর হিসাব কোথায়? কোনো অর্থ যদি বৈধ ফি হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে নির্দিষ্ট খাত, অনুমোদন ও রসিদ থাকার কথা। কিন্তু সব অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে সেই স্বচ্ছতা দেখা যায় না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, প্রতিদিন শত শত দোকান থেকে বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায় হলে মোট অঙ্ক কত দাঁড়ায়? কারা এসব অর্থ সংগ্রহ করছেন, কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, ব্যাংক হিসাবে জমা হচ্ছে কি না এবং ব্যবসায়ীদের রসিদ দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগ বাক্স স্থাপনের দাবি

চাঁদাবাজি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে জানাতে ভয় পাওয়ায় গুলিস্তানের প্রতিটি মার্কেটে অভিযোগ বাক্স স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

তাদের মতে, অভিযোগ বাক্স থাকলে ব্যবসায়ীরা পরিচয় গোপন রেখে অর্থ আদায়কারীদের নাম, আদায়ের পরিমাণ, অর্থ নেওয়ার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য দিতে পারবেন। পরে প্রশাসন এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ঘটনা বের করতে পারবে।

এক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বলেন, তারা কারও সঙ্গে সংঘাতে যেতে চান না। তারা শুধু নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা করতে চান। প্রশাসন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তদন্ত করলেই নেপথ্যে থাকা অর্থ আদায়ের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

ব্যবসায়ীদের মতে, বিষয়টি শুধু চাঁদাবাজির অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো ব্যবসায়ীর নিরাপত্তা, জীবিকা এবং স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা করার অধিকার।

তাদের দাবি, কার নামের সঙ্গে অভিযোগ জড়িত—তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কত টাকা আদায় হচ্ছে, কার মাধ্যমে আদায় হচ্ছে, কোন খাতে নেওয়া হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে—তা খুঁজে বের করা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রশাসন গুলিস্তানের প্রতিটি মার্কেটে অভিযোগ বাক্স স্থাপন করে পাওয়া অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করলে নেপথ্যে থাকা অর্থ আদায়ের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে বৈধ ফি ও অবৈধ অর্থ আদায়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হবে এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতিও বাড়বে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা চক্রের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


গুলিস্তানে নানা অজুহাতে অতিরিক্ত চাঁদা আদায়, নীরব জিম্মি হাজারো ব্যবসায়ী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ আগষ্ট ২০২৬ ১৯:০৮ পিএম

ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র গুলিস্তান। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে সরগরম থাকে এখানকার মার্কেটগুলো। এসব মার্কেটকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজারো ব্যবসায়ী ও কর্মচারী। তবে ব্যবসার পাশাপাশি নানা অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে উদ্বেগ ও চাপের মধ্যে রয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দোকানের সামনের জায়গা ব্যবহার, নিরাপত্তা, মার্কেট ব্যবস্থাপনা কিংবা বিভিন্ন সুবিধার নামে নিয়মিত অর্থ দাবি করা হয়। নির্দিষ্ট সময় পরপর এসব অর্থ আদায় করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই দেওয়া হয় না কোনো রসিদ। ফলে আদায়কৃত অর্থের বৈধতা, হিসাব ও শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব অর্থ আদায়ের নেপথ্যে কথিত একটি ‘দরবেশ চক্র’ সক্রিয় রয়েছে। তাদের দাবি, চক্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন মামলা রয়েছে। এমনকি তাদের মধ্যে বিএনপি নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী আলমের গুম মামলার আসামিও রয়েছেন বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগের সরকারের সময় যারা বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সরকার পরিবর্তনের পরও তাদের প্রভাব পুরোপুরি কমেনি। বরং পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে তারা নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।

তবে প্রকাশ্যে নাম বলতে চান না অধিকাংশ ব্যবসায়ী। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগকারীর পরিচয় প্রকাশ হলে ব্যবসার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন তারা।

এক ব্যবসায়ী বলেন, ব্যবসা পরিচালনার স্বাভাবিক খরচের বাইরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে টাকা দিতে হয়। না দিলে সমস্যা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেকে প্রতিবাদ করেন না।

আরেক ব্যবসায়ী প্রশ্ন তোলেন, নিয়মিত অর্থ আদায় হলে এর হিসাব কোথায়? কোনো অর্থ যদি বৈধ ফি হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে নির্দিষ্ট খাত, অনুমোদন ও রসিদ থাকার কথা। কিন্তু সব অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে সেই স্বচ্ছতা দেখা যায় না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, প্রতিদিন শত শত দোকান থেকে বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায় হলে মোট অঙ্ক কত দাঁড়ায়? কারা এসব অর্থ সংগ্রহ করছেন, কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, ব্যাংক হিসাবে জমা হচ্ছে কি না এবং ব্যবসায়ীদের রসিদ দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগ বাক্স স্থাপনের দাবি

চাঁদাবাজি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে জানাতে ভয় পাওয়ায় গুলিস্তানের প্রতিটি মার্কেটে অভিযোগ বাক্স স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

তাদের মতে, অভিযোগ বাক্স থাকলে ব্যবসায়ীরা পরিচয় গোপন রেখে অর্থ আদায়কারীদের নাম, আদায়ের পরিমাণ, অর্থ নেওয়ার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য দিতে পারবেন। পরে প্রশাসন এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ঘটনা বের করতে পারবে।

এক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বলেন, তারা কারও সঙ্গে সংঘাতে যেতে চান না। তারা শুধু নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা করতে চান। প্রশাসন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তদন্ত করলেই নেপথ্যে থাকা অর্থ আদায়ের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

ব্যবসায়ীদের মতে, বিষয়টি শুধু চাঁদাবাজির অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো ব্যবসায়ীর নিরাপত্তা, জীবিকা এবং স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা করার অধিকার।

তাদের দাবি, কার নামের সঙ্গে অভিযোগ জড়িত—তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কত টাকা আদায় হচ্ছে, কার মাধ্যমে আদায় হচ্ছে, কোন খাতে নেওয়া হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে—তা খুঁজে বের করা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রশাসন গুলিস্তানের প্রতিটি মার্কেটে অভিযোগ বাক্স স্থাপন করে পাওয়া অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করলে নেপথ্যে থাকা অর্থ আদায়ের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে বৈধ ফি ও অবৈধ অর্থ আদায়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হবে এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতিও বাড়বে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা চক্রের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর