৭ মাসে নিখোঁজ ১৫ হাজার ৭১৭
শিশু নিখোঁজের জিডি নিতেই গড়িমসি, উদ্ধারে পুলিশের ‘অনীহা’
শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নিতে পুলিশের গড়িমসি এবং পরে তদন্ত ও উদ্ধারে অসহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার নিখোঁজ শিশুদের স্বজনদের অভিযোগ, সন্তান হারানোর পর থানায় ছুটে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া হয় না। জিডি করতে গেলেও নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আবার জিডি হলেও শিশুকে উদ্ধারে পুলিশের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বজনরা।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সামাজিক সংগঠন মুন এলার্ট আয়োজিত হারিয়ে যাওয়া শিশুদের খুঁজে পেতে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন নিখোঁজ শিশুদের অভিভাবক ও স্বজনরা। সংবাদ সম্মেলনে অন্তত ৩৫টি ভুক্তভোগী পরিবার অংশ নেয়। তাদের মধ্যে অন্তত দুই ডজন স্বজন বক্তব্য দেন। এ সময় অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং সন্তানদের ফিরে পেতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
গত ৩০ আগস্ট রাজধানীর বনানী সৈনিক ক্লাবের সামনে চার বছরের শিশু সাইবা নিখোঁজ হয়। ওই দিন বিকেলে মেয়েকে নিয়ে জুতা কিনতে গিয়েছিলেন মা বিথী আক্তার। ফুটওভার ব্রিজের গোড়ায় শিশুটিকে দাঁড় করিয়ে পাশের ফুটপাতে জুতা কিনতে যান তিনি। মাত্র পাঁচ মিনিট পর ফিরে এসে মেয়েকে আর দেখতে পাননি।

এরপর সন্তানকে খুঁজতে বনানী থানায় যান বিথী। তাঁর অভিযোগ, নিখোঁজের দিন এবং পরদিন থানায় গেলেও পুলিশ তাঁর জিডি নেয়নি। বরং তাঁকে থানা থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে তাঁর মাকে সঙ্গে নিয়ে আবার থানায় গেলে জিডি নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে, নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দুই দিন পর জিডি গ্রহণ করা হয়।
সাইবার নানী শরীফা বেগমের অভিযোগ, জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁকে আলাদাভাবে ডেকে বলেন, ‘বাচ্চা খুঁজে বের করা পুলিশের কাজ নয়, আমাদের অন্যান্য কাজ আছে; আপনারা নিজেরা খোঁজ পেলে জানাবেন, আমরা গিয়ে উদ্ধার করে দেব।’
শরীফা বেগম আরও অভিযোগ করেন, তদন্ত কর্মকর্তা তাঁদের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা উল্লেখ করে কোনো প্রভাবশালী স্থানীয় নেতার সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর দাবি, এক সপ্তাহ পার হলেও পুলিশ আর কোনো ধরনের যোগাযোগ বা কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. বিল্লাল হোসেন। তিনি বলেন, জিডির কপি পাওয়ার পরপরই তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে শিশুটি যেখানে নিখোঁজ হয়েছে সেখানে কোনো সিসিটিভি না থাকায় এখনো ফুটেজ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর ভাষ্য, পুলিশের পক্ষ থেকে যা করণীয়, তা করা হয়েছে এবং তাঁরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন।

পুলিশ বলছে, শিশু নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখার জন্য মাঠপর্যায়ের সদস্যদের নির্দেশনা রয়েছে। পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, কোনো থানা জিডি নিতে অনীহা বা অসহযোগিতা করেছে—এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, শিশু উদ্ধারে জিডি নেওয়াই শুধু পুলিশের কাজ নয়, শিশুকে উদ্ধার করাও পুলিশের দায়িত্ব। কোনো তদন্ত কর্মকর্তা স্বজনদের নিজেরাই শিশু খুঁজতে বলেছেন—এমনটি বলার সুযোগ নেই। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, কোন কোন থানায় গিয়ে ভুক্তভোগীরা অসহযোগিতা পেয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে অভিযোগ যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ শিশু, যা মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো উদ্ধার হয়নি ৬৮ শিশু।
অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ১ হাজার ৯৭০ জন।
তবে নিখোঁজ শিশুদের স্বজনদের অভিযোগ, পরিসংখ্যানের বাইরে রয়েছে আরও অনেক পরিবারের অসহায়ত্ব। তাদের দাবি, শিশু হারানোর পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা ও প্রথম কয়েক দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুলিশের গাফিলতি ও দেরির কারণে অনেক ক্ষেত্রে উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খুলনার কয়রা থেকে হারিয়ে যাওয়া সামিরার মা বিলকিস বেগমও সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ করেন। গত বছরের ২৬ আগস্ট কয়রার বাজার থেকে তাঁর মেয়ে সামিরা নিখোঁজ হয়। স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, আজমির নামের ১৯ বছর বয়সী এক যুবক শিশুটিকে ভ্যানে বসিয়ে মিষ্টি খাইয়েছিল। পরে পুলিশ ওই যুবককে থানায় নিয়ে গেলেও তাঁকে গ্রেপ্তার না করে জিডি করে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন বিলকিস।
তাঁর অভিযোগ, থানায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওই যুবক শিশুটিকে চেনার কথা স্বীকার করলেও পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। তাঁর দাবি, ঘটনার শুরুতেই কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হয়তো মেয়েকে উদ্ধার করা সম্ভব হতো।
এদিকে রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকা থেকে গত ১৩ মে নিখোঁজ হয় শিশু মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তার বাবা মোহাম্মদ জসিম একজন ফুচকা বিক্রেতা। তাঁর দাবি, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ইব্রাহিম রাত ৭টা ৪০ মিনিটে ভবনের ভেতরে ঢুকেছিল। এরপর তাকে আর ভবন থেকে বের হতে দেখা যায়নি।
জসিমের অভিযোগ, পল্লবী থানা প্রথমে তাঁর ছেলের নিখোঁজের জিডি নেয়নি। দুই দিন পর ১৫ মে জিডি নেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘদিন ঘোরানোর পর তদন্ত ডিবির হাতে দেওয়া হয়। সন্তানের সন্ধান না পাওয়ায় তিনি আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানান।
সংবাদ সম্মেলনে রাজবাড়ী থেকে আসা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মো. নজরুল ইসলামও নিজের সন্তান তামিমকে হারানোর বেদনার কথা তুলে ধরেন। গত বছরের ২০ মে স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বের হওয়ার পর তাঁর সন্তান নিখোঁজ হয়। ১৬ মাস ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছেলেকে খুঁজে বেড়িয়েও সন্ধান পাননি তিনি।
নজরুল ইসলামের দাবি, সাবেক পুলিশ সদস্য হয়েও তিনি সন্তান উদ্ধারে পুলিশের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। সন্তানকে খুঁজতে গিয়ে তাঁর ২৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মুন এলার্টের তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির কার্যক্রম শুরুর পর থেকে তাদের কাছে শিশু নিখোঁজের ১ হাজার ২২৬টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে পুলিশের সহযোগিতায় আট শতাধিক শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় ১৭১টি এলার্ট জারি করা হয় এবং এলার্ট জারির পর ১১৯ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে।
মুন এলার্টের প্রধান সমন্বয়কারী সাদাত রহমান বলেন, উন্নত দেশগুলোতে শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, বাংলাদেশেও সে ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি করার প্রয়োজন যেন না থাকে, বরং অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত উদ্ধারে নেমে পড়ে—এমন ব্যবস্থা চান তাঁরা।
তিনি বলেন, শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সরকার, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তাদের লক্ষ্য, নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার এবং এ ধরনের ঘটনায় পুলিশের কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: