তফসিলের আগেই বৈদ্যেরবাজারে নির্বাচনী হাওয়া, বিএনপিতে নোবেল-আওলাদকে নিয়ে জল্পনা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তবে এর আগেই নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নে শুরু হয়েছে নির্বাচনী তোড়জোড়। সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা, কর্মী-সমর্থকদের তৎপরতা ও ভোটের হিসাব-নিকাশে সরগরম হয়ে উঠেছে এই ইউনিয়নের রাজনৈতিক মাঠ।
রাজনৈতিক ও স্থানীয় সূত্র বলছে, চলতি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আছে। এ কারণে বৈদ্যেরবাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান জানান দিতে শুরু করেছেন।
এর মধ্যে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দুজনের নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে। তাঁরা হলেন উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরে ইয়াসীন (নোবেল) এবং বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি গাজী আওলাদ হোসাইন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ঘরানার নেতাদের মধ্যেও সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে চলছে নানা সমীকরণ।
বিএনপিতে নোবেল ও আওলাদকে ঘিরে আলোচনা
বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে নুরে ইয়াসীনকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীদের অনেকে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রাজপথে সক্রিয় থাকার কারণে দলে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। তবে গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন (ড্রেজিং), জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। এসব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা যায়, এসব অভিযোগের কারণে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় যুবদলের পক্ষ থেকে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে গাজী আওলাদ হোসাইনকে ঘিরে রয়েছে ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ। তিনি বৈদ্যেরবাজার ইউপির প্রয়াত চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা গাজী আবু তালেবের ছেলে। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য, সাংগঠনিক পরিচিতি ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন বলে মনে করছে স্থানীয় বিএনপির একাংশ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে গাজী আবু তালেব ‘দেয়ালঘড়ি’ প্রতীকে ছয় হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বৈদ্যেরবাজারে গাজী পরিবারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভিত্তির উদাহরণ হিসেবে দেখেন স্থানীয়রা। আওলাদ হোসাইনের সমর্থকদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি মামলা, গ্রেপ্তার ও পুলিশি হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ কারণে বিএনপির স্থানীয় একটি অংশ তাঁকে ‘নির্যাতিত সংগঠক’ ও ‘ক্লিন ইমেজের’ (স্বচ্ছ ভাবমূর্তি) প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছে। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পারিবারিক পরিচিতিও নির্বাচনী মাঠে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আওয়ামী লীগ ঘরানাতেও চলছে হিসাব-নিকাশ
বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ঘরানার নেতাদের মধ্যেও সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছে। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল্লাহ আল মামুন স্থানীয়ভাবে পরিচিত মুখ। ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেন স্থানীয়দের একাংশ। তবে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও পরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্থানীয়ভাবে নানা মত রয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে। গত জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সহিংসতা ও হত্যার ঘটনায় করা তিনটি মামলায় তিনি আসামি—এ বিষয়টিও এখন স্থানীয় রাজনীতিতে অন্যতম আলোচনার বিষয়।
অন্যদিকে বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের প্রভাবশালী সরকারবাড়ির বাচ্চু সরকারকেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক মহলের কেউ কেউ। এলাকায় সরকারবাড়ির বড় একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। ফলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হলে ভোটের সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা।
পারিবারিক ভোটব্যাংক বনাম সাংগঠনিক শক্তি
স্থানীয় ব্যক্তিরা মনে করছেন, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের নির্বাচনী রাজনীতিতে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি পারিবারিক প্রভাব ও ভোটব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে গাজী ও সরকার পরিবারের দীর্ঘদিনের স্থানীয় প্রভাব নির্বাচনের মাঠে প্রার্থীদের অবস্থান নির্ধারণে বড় নিয়ামক হতে পারে। বিএনপির সম্ভাব্য দুই প্রার্থীর ক্ষেত্রে একদিকে সাংগঠনিক ও রাজপথে সক্রিয়তা, অন্যদিকে পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য—এই দুই সমীকরণকে সামনে রেখে আলোচনা চলছে।
তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে এই আলোচনা নির্বাচনী মাঠে আগাম উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বিএনপির নুরে ইয়াসীন ও গাজী আওলাদের মধ্যে কে শেষ পর্যন্ত দলীয় সমর্থন পাবেন, নাকি শেষ মুহূর্তে নতুন কোনো নাম সামনে আসবে—তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। একইভাবে আওয়ামী লীগ ঘরানার সম্ভাব্য প্রার্থীদের চূড়ান্ত সমীকরণও এখনো স্পষ্ট নয়।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় সিদ্ধান্ত, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, পারিবারিক প্রভাব ও স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করবে নির্বাচনের চূড়ান্ত হিসাব। তফসিল ঘোষণা ও দলীয় সিদ্ধান্তের পরই বৈদ্যেরবাজার ইউপির নির্বাচনী মাঠে কে কার প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন, তা পুরোপুরি পরিষ্কার হবে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: