infoamaderdin@gmail.com সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

খুন-গুলি-মাদক-কিশোর গ্যাংয়ে অশান্ত পল্লবী, তৈরি হচ্ছে ‘আরেক মোহাম্মদপুর’?

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০৯ পিএম

রাজধানীর একসময়ের শান্ত আবাসিক এলাকা পল্লবী ক্রমেই অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। খুন, প্রকাশ্যে গুলি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও কিশোর গ্যাংয়ের দাপটে এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েক মাসের একের পর এক ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীর প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের এই আবাসিক এলাকা কি ধীরে ধীরে আরেক মোহাম্মদপুরে পরিণত হচ্ছে?

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, পল্লবীর অপরাধচিত্র আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই। মাদক কারবার, অর্থের ভাগাভাগি, অস্ত্রের ব্যবহার এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের পাশাপাশি অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোরদের একটি অংশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র-মাদক উদ্ধারের দাবি করলেও স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাটছে না।

গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুর বাংলা স্কুল এলাকায় পল্লবী ট্রাফিক জোনের এক পুলিশ সদস্য সন্দেহের ভিত্তিতে একটি অটোরিকশা থামান। সেখান থেকে জিম্মি অবস্থায় অর্ক নামে এক কিশোরকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মোহাম্মদ রাব্বি নামে ১৯ বছর বয়সী একজনকে আটক করা হলেও তার আরও তিন সহযোগী অন্ধকারের সুযোগে পালিয়ে যায়।

এর আগে গত ৭ আগস্ট পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় সিনেমার দৃশ্যের মতো গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। এতে এক নারী পথচারীসহ দুজন আহত হন। পরে ডিবি পুলিশ ল্যাংড়া রুবেলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি, তাঁদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি, ম্যাগাজিন, এক হাজার ইয়াবা ও দুটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, মাদক বিক্রির ১৫ লাখ টাকা ভাগাভাগি ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওই হামলা চালানো হয়েছিল।

পল্লবীতে খুনের ঘটনাও আতঙ্ক বাড়িয়েছে। গত ১৭ এপ্রিল ১২ নম্বর সেকশনের ডি ব্লকের একটি বাসা থেকে প্রবীণ স্কুলশিক্ষিকা ফিরোজা খানম জোছনার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর মাথায় ভারী হাতুড়ি দিয়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল।

এর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯ মে ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকে আট বছর বয়সী রামিসা আক্তারকে যৌন নির্যাতনের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও সিআইডির তদন্তে প্রতিবেশী সোহেল রানার নাম উঠে আসে এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও পল্লবীতে একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। গত ১০ জুন ১২ নম্বর সেকশনের এভিনিউ-৫ এলাকায় ল্যাংড়া রুবেল ও টান আকাশ চক্রের মধ্যে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও তাণ্ডবের ঘটনা ঘটে। এতে হৃদয় ওরফে গন্ডার নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন এবং আবদুল্লাহ নামে এক তরুণকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে।

ওই ঘটনার পর ১৬ জুন সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ১৩ মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি আকাশ ওরফে টান আকাশকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৪। একই দিনে বিহারি পল্লি এলাকায় সিটিটিসির পৃথক অভিযানে সাত হাজার ইয়াবাসহ সাদ্দাম নামে এক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

৭ আগস্ট মিল্লাত ক্যাম্পে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে লক্ষ্য করে লাল রঙের একটি প্রাইভেটকার থেকে গুলি চালানো হয়। এতে আলমগীরের মাথা ও পিঠে গুলি লাগে। পাশে থাকা জ্যোৎস্না নামে এক নারী পথচারীও গুলিবিদ্ধ হন। পরে ১০ আগস্ট সাভার, গাজীপুর ও কুষ্টিয়ায় অভিযান চালিয়ে ডিবি পুলিশ ল্যাংড়া রুবেলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।

পুলিশের তদন্তে মাদক ব্যবসার ১৫ লাখ টাকা ভাগাভাগি এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে ওই হামলার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

রিকশাচালক থেকে ‘ল্যাংড়া রুবেল’

পুলিশ ও স্থানীয় অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ল্যাংড়া রুবেল ২০১১ সালে চুরি ও ছিনতাইয়ের মাধ্যমে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসহ তার বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি মামলা হয়। কয়েক বছর আগে পল্লবীর ডি ব্লকে ছিনতাইয়ের সময় পুলিশের গুলিতে তার এক পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরে সে অটোরিকশা চালানো শুরু করলেও সেটি ছিল অনেকটা আড়ালের কাজ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পল্লবীতে তার প্রভাব আরও বেড়ে যায় বলে স্থানীয় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

তার ভাই বাপ্পা মাদক সিন্ডিকেটের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পল্লবীর ৩৯টি বিহারি ক্যাম্প, বাউনিয়া বাঁধ, কাফরুল এবং মিরপুর ১০-১১ এলাকা মিলিয়ে দুই শতাধিক গোপন স্পটে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার

পল্লবীর অপরাধচিত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি কিশোর গ্যাং। ঢাকা মহানগর পুলিশের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০ থানায় সক্রিয় কিশোর গ্যাং রয়েছে ১১৮টি। এর মধ্যে মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে এর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

মিরপুর বিভাগের সাত থানায় সক্রিয় ৩২টি গ্রুপের মধ্যে শুধু পল্লবী এলাকাতেই রয়েছে ১৪টি।

গত ১৭ জুন পল্লবীর আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘ভইরা দে’র সদস্য শিশির আহম্মেদ ইমন, আবদুল্লাহ ও আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পারভেজসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলে গ্রুপটির মোট ১০ সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। পুলিশের অভিযোগ, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ভিডিও প্রকাশ করে আতঙ্ক তৈরি করত।

৪ জুলাই বাউনিয়াবাদ থেকে ১০ মামলার আসামি মুন্না ওরফে রেড মুন্নাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ৫ ও ৬ জুলাই ভইরা দে গ্রুপের পারভেজসহ আরও ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ছিনতাইও যেন নিত্যদিনের ঘটনা

কালশী মোড়, মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১২ এলাকায় প্রকাশ্য ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। জুন ও জুলাইয়ে ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতায় অন্তত কয়েকজন ছিনতাইকারী হাতেনাতে আটক হয়।

১৯ জুন কালশী মোড়ে চলন্ত মাইক্রোবাস থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে পালানোর সময় একজনকে আটক করা হয়। ১৮ জুন মিরপুর-১০ এলাকা থেকে আরমান এবং ১৫ জুলাই বনলতা সুইটসের সামনে থেকে রিমন নামে এক ছিনতাইকারীকে আটক করা হয়।

সবশেষ ১ সেপ্টেম্বর রাতে মেট্রোরেলের ২২২ নম্বর পিলারের কাছে জিম্মি কিশোর অর্ককে উদ্ধারের ঘটনায়ও পল্লবীর অপরাধচক্রের একটি চিত্র সামনে আসে।

চাঁদাবাজদের দাপট

পল্লবীতে মাদক ও অস্ত্রের পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগও বাড়ছে। গত ২২ জুলাই বাউনিয়াবাদ মসজিদ মার্কেট এলাকায় রামদা-চাপাতি নিয়ে দোকানে তাণ্ডব চালিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে।

এ ছাড়া বাড়ি নির্মাণ ও জমি কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগও রয়েছে। বিহারি ক্যাম্পের ৩ নম্বর লাইনে মাদকের টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে ‘পেপার সানি’ নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

লালমাটি টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকায় দুই পক্ষের গোলাগুলির মাঝখানে পড়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গৃহবধূ আয়েশা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনাও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। গ্যাং সংঘর্ষ ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে ফয়সাল ও পাভেল নামে আরও দুই তরুণের প্রাণ গেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

পুলিশের তালিকায় মাদকের ১৭ স্পট

ঢাকা মহানগর পুলিশের হালনাগাদ তথ্যে পল্লবী থানা এলাকায় মাদকের ১৭টি স্পট এবং ১৭ জন চিহ্নিত ডিলারের তথ্য রয়েছে। এসব ডিলারের অধীনে শতাধিক খুচরা বিক্রেতা কাজ করে বলে পুলিশের তথ্য।

পল্লবীর বিভিন্ন সেকশন ও ক্যাম্প এলাকায় চিহ্নিত মাদক কারবারিদের মধ্যে রাজিয়া খাতুন, নাটা জুম্মন, ফাতেমা বেগম ওরফে ফতেহ, ল্যাংড়া রুবেল, শাহজামান ওরফে সাবু, শাহনাজ, হালিমা ওরফে নাজ খাতুন, রুমাসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মিল্লাত ক্যাম্পের সরু গলিতে বিকেল হলেই মাদকের কেনাবেচা জমে ওঠে। ক্রেতাদের সেখানে ‘বান্ধা কাস্টমার’ নামে ডাকা হয়। কালশী মোড়ের ফুটপাতেও সাধারণ মানুষের ভিড়ে মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

মে মাসে পল্লবীতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে দুই দফায় ৫২ জন অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও স্থানীয়দের দাবি, জামিনে বেরিয়ে তাদের অনেকেই আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে

গত ২৯ আগস্ট পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পে লাশ গোসলের ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। পানির পাম্প বসানো নিয়ে বিরোধ থেকে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরে গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ঘটনাস্থলে গুলির খোসা পাওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়।

ঘটনাটি মাদকচক্রের সংঘর্ষ না হলেও সামান্য বিরোধ কীভাবে দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, তার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

‘আরেক মোহাম্মদপুর’ হওয়ার আশঙ্কা

পল্লবীর বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাম্প্রতিক অপরাধচিত্রের মিল খুঁজে পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। দুই এলাকাতেই খুন, কিশোর গ্যাং, মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে।

ডিএমপির তালিকায় মোহাম্মদপুরে ১৬টি এবং পল্লবীতে ১৪টি কিশোর গ্যাং থাকার তথ্যও দুই এলাকার তুলনাকে আরও জোরালো করেছে।

এলাকাবাসীর দাবি, প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সাময়িক টহল বা কয়েকজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না। মাদকের ঘাঁটি ধ্বংস, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।

অপরাধ বিশ্লেষক লে. কর্নেল (অব.) দিদারুল আলম বলেন, পল্লবীর ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে তিনটি স্তর স্পষ্ট হয়। প্রথমত, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজি থেকে অর্থের উৎস তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, কিশোর গ্যাং ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ অপরাধ সংগঠনের কাঠামো তৈরি করছে। তৃতীয়ত, অস্ত্র, ভয়ভীতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্য সহিংসতার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, একই এলাকায় যখন এই তিনটি স্তর বারবার দেখা যায়, তখন ঘটনাগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছে ঠিকই; তবে অর্থের উৎস ও অপরাধের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া না গেলে একই চক্র আবার ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে।

পুলিশের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক শাহাদাত হোসাইন বলেন, রাজধানীর যেসব এলাকায় অপরাধ ঘটছে, সেসব এলাকায় দ্রুত অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ করে কেউ রেহাই পাবে না।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


খুন-গুলি-মাদক-কিশোর গ্যাংয়ে অশান্ত পল্লবী, তৈরি হচ্ছে ‘আরেক মোহাম্মদপুর’?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০৯ পিএম

রাজধানীর একসময়ের শান্ত আবাসিক এলাকা পল্লবী ক্রমেই অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। খুন, প্রকাশ্যে গুলি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও কিশোর গ্যাংয়ের দাপটে এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েক মাসের একের পর এক ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীর প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের এই আবাসিক এলাকা কি ধীরে ধীরে আরেক মোহাম্মদপুরে পরিণত হচ্ছে?

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, পল্লবীর অপরাধচিত্র আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই। মাদক কারবার, অর্থের ভাগাভাগি, অস্ত্রের ব্যবহার এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের পাশাপাশি অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোরদের একটি অংশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র-মাদক উদ্ধারের দাবি করলেও স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাটছে না।

গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুর বাংলা স্কুল এলাকায় পল্লবী ট্রাফিক জোনের এক পুলিশ সদস্য সন্দেহের ভিত্তিতে একটি অটোরিকশা থামান। সেখান থেকে জিম্মি অবস্থায় অর্ক নামে এক কিশোরকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মোহাম্মদ রাব্বি নামে ১৯ বছর বয়সী একজনকে আটক করা হলেও তার আরও তিন সহযোগী অন্ধকারের সুযোগে পালিয়ে যায়।

এর আগে গত ৭ আগস্ট পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় সিনেমার দৃশ্যের মতো গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। এতে এক নারী পথচারীসহ দুজন আহত হন। পরে ডিবি পুলিশ ল্যাংড়া রুবেলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি, তাঁদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি, ম্যাগাজিন, এক হাজার ইয়াবা ও দুটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, মাদক বিক্রির ১৫ লাখ টাকা ভাগাভাগি ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওই হামলা চালানো হয়েছিল।

পল্লবীতে খুনের ঘটনাও আতঙ্ক বাড়িয়েছে। গত ১৭ এপ্রিল ১২ নম্বর সেকশনের ডি ব্লকের একটি বাসা থেকে প্রবীণ স্কুলশিক্ষিকা ফিরোজা খানম জোছনার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর মাথায় ভারী হাতুড়ি দিয়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল।

এর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯ মে ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকে আট বছর বয়সী রামিসা আক্তারকে যৌন নির্যাতনের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও সিআইডির তদন্তে প্রতিবেশী সোহেল রানার নাম উঠে আসে এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও পল্লবীতে একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। গত ১০ জুন ১২ নম্বর সেকশনের এভিনিউ-৫ এলাকায় ল্যাংড়া রুবেল ও টান আকাশ চক্রের মধ্যে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও তাণ্ডবের ঘটনা ঘটে। এতে হৃদয় ওরফে গন্ডার নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন এবং আবদুল্লাহ নামে এক তরুণকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে।

ওই ঘটনার পর ১৬ জুন সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ১৩ মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি আকাশ ওরফে টান আকাশকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৪। একই দিনে বিহারি পল্লি এলাকায় সিটিটিসির পৃথক অভিযানে সাত হাজার ইয়াবাসহ সাদ্দাম নামে এক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

৭ আগস্ট মিল্লাত ক্যাম্পে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে লক্ষ্য করে লাল রঙের একটি প্রাইভেটকার থেকে গুলি চালানো হয়। এতে আলমগীরের মাথা ও পিঠে গুলি লাগে। পাশে থাকা জ্যোৎস্না নামে এক নারী পথচারীও গুলিবিদ্ধ হন। পরে ১০ আগস্ট সাভার, গাজীপুর ও কুষ্টিয়ায় অভিযান চালিয়ে ডিবি পুলিশ ল্যাংড়া রুবেলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।

পুলিশের তদন্তে মাদক ব্যবসার ১৫ লাখ টাকা ভাগাভাগি এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে ওই হামলার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

রিকশাচালক থেকে ‘ল্যাংড়া রুবেল’

পুলিশ ও স্থানীয় অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ল্যাংড়া রুবেল ২০১১ সালে চুরি ও ছিনতাইয়ের মাধ্যমে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসহ তার বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি মামলা হয়। কয়েক বছর আগে পল্লবীর ডি ব্লকে ছিনতাইয়ের সময় পুলিশের গুলিতে তার এক পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরে সে অটোরিকশা চালানো শুরু করলেও সেটি ছিল অনেকটা আড়ালের কাজ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পল্লবীতে তার প্রভাব আরও বেড়ে যায় বলে স্থানীয় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

তার ভাই বাপ্পা মাদক সিন্ডিকেটের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পল্লবীর ৩৯টি বিহারি ক্যাম্প, বাউনিয়া বাঁধ, কাফরুল এবং মিরপুর ১০-১১ এলাকা মিলিয়ে দুই শতাধিক গোপন স্পটে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার

পল্লবীর অপরাধচিত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি কিশোর গ্যাং। ঢাকা মহানগর পুলিশের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০ থানায় সক্রিয় কিশোর গ্যাং রয়েছে ১১৮টি। এর মধ্যে মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে এর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

মিরপুর বিভাগের সাত থানায় সক্রিয় ৩২টি গ্রুপের মধ্যে শুধু পল্লবী এলাকাতেই রয়েছে ১৪টি।

গত ১৭ জুন পল্লবীর আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘ভইরা দে’র সদস্য শিশির আহম্মেদ ইমন, আবদুল্লাহ ও আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পারভেজসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলে গ্রুপটির মোট ১০ সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। পুলিশের অভিযোগ, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ভিডিও প্রকাশ করে আতঙ্ক তৈরি করত।

৪ জুলাই বাউনিয়াবাদ থেকে ১০ মামলার আসামি মুন্না ওরফে রেড মুন্নাকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ৫ ও ৬ জুলাই ভইরা দে গ্রুপের পারভেজসহ আরও ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ছিনতাইও যেন নিত্যদিনের ঘটনা

কালশী মোড়, মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১২ এলাকায় প্রকাশ্য ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। জুন ও জুলাইয়ে ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতায় অন্তত কয়েকজন ছিনতাইকারী হাতেনাতে আটক হয়।

১৯ জুন কালশী মোড়ে চলন্ত মাইক্রোবাস থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে পালানোর সময় একজনকে আটক করা হয়। ১৮ জুন মিরপুর-১০ এলাকা থেকে আরমান এবং ১৫ জুলাই বনলতা সুইটসের সামনে থেকে রিমন নামে এক ছিনতাইকারীকে আটক করা হয়।

সবশেষ ১ সেপ্টেম্বর রাতে মেট্রোরেলের ২২২ নম্বর পিলারের কাছে জিম্মি কিশোর অর্ককে উদ্ধারের ঘটনায়ও পল্লবীর অপরাধচক্রের একটি চিত্র সামনে আসে।

চাঁদাবাজদের দাপট

পল্লবীতে মাদক ও অস্ত্রের পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগও বাড়ছে। গত ২২ জুলাই বাউনিয়াবাদ মসজিদ মার্কেট এলাকায় রামদা-চাপাতি নিয়ে দোকানে তাণ্ডব চালিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে।

এ ছাড়া বাড়ি নির্মাণ ও জমি কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগও রয়েছে। বিহারি ক্যাম্পের ৩ নম্বর লাইনে মাদকের টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে ‘পেপার সানি’ নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

লালমাটি টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকায় দুই পক্ষের গোলাগুলির মাঝখানে পড়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গৃহবধূ আয়েশা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনাও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। গ্যাং সংঘর্ষ ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে ফয়সাল ও পাভেল নামে আরও দুই তরুণের প্রাণ গেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

পুলিশের তালিকায় মাদকের ১৭ স্পট

ঢাকা মহানগর পুলিশের হালনাগাদ তথ্যে পল্লবী থানা এলাকায় মাদকের ১৭টি স্পট এবং ১৭ জন চিহ্নিত ডিলারের তথ্য রয়েছে। এসব ডিলারের অধীনে শতাধিক খুচরা বিক্রেতা কাজ করে বলে পুলিশের তথ্য।

পল্লবীর বিভিন্ন সেকশন ও ক্যাম্প এলাকায় চিহ্নিত মাদক কারবারিদের মধ্যে রাজিয়া খাতুন, নাটা জুম্মন, ফাতেমা বেগম ওরফে ফতেহ, ল্যাংড়া রুবেল, শাহজামান ওরফে সাবু, শাহনাজ, হালিমা ওরফে নাজ খাতুন, রুমাসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মিল্লাত ক্যাম্পের সরু গলিতে বিকেল হলেই মাদকের কেনাবেচা জমে ওঠে। ক্রেতাদের সেখানে ‘বান্ধা কাস্টমার’ নামে ডাকা হয়। কালশী মোড়ের ফুটপাতেও সাধারণ মানুষের ভিড়ে মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

মে মাসে পল্লবীতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে দুই দফায় ৫২ জন অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও স্থানীয়দের দাবি, জামিনে বেরিয়ে তাদের অনেকেই আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে

গত ২৯ আগস্ট পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পে লাশ গোসলের ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। পানির পাম্প বসানো নিয়ে বিরোধ থেকে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরে গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ঘটনাস্থলে গুলির খোসা পাওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়।

ঘটনাটি মাদকচক্রের সংঘর্ষ না হলেও সামান্য বিরোধ কীভাবে দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, তার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

‘আরেক মোহাম্মদপুর’ হওয়ার আশঙ্কা

পল্লবীর বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাম্প্রতিক অপরাধচিত্রের মিল খুঁজে পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। দুই এলাকাতেই খুন, কিশোর গ্যাং, মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে।

ডিএমপির তালিকায় মোহাম্মদপুরে ১৬টি এবং পল্লবীতে ১৪টি কিশোর গ্যাং থাকার তথ্যও দুই এলাকার তুলনাকে আরও জোরালো করেছে।

এলাকাবাসীর দাবি, প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সাময়িক টহল বা কয়েকজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না। মাদকের ঘাঁটি ধ্বংস, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।

অপরাধ বিশ্লেষক লে. কর্নেল (অব.) দিদারুল আলম বলেন, পল্লবীর ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে তিনটি স্তর স্পষ্ট হয়। প্রথমত, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজি থেকে অর্থের উৎস তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, কিশোর গ্যাং ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ অপরাধ সংগঠনের কাঠামো তৈরি করছে। তৃতীয়ত, অস্ত্র, ভয়ভীতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্য সহিংসতার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, একই এলাকায় যখন এই তিনটি স্তর বারবার দেখা যায়, তখন ঘটনাগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছে ঠিকই; তবে অর্থের উৎস ও অপরাধের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া না গেলে একই চক্র আবার ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে।

পুলিশের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক শাহাদাত হোসাইন বলেন, রাজধানীর যেসব এলাকায় অপরাধ ঘটছে, সেসব এলাকায় দ্রুত অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ করে কেউ রেহাই পাবে না।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর