infoamaderdin@gmail.com শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
৭ ভাদ্র ১৪৩৩

তামান্নার আড়ঙ্গ: ঘর থেকে গড়ে ওঠা এক নারীর ফ্যাশন হাউজ

রায়হান আহমদ প্রকাশিত: ২২ আগষ্ট ২০২৬ ১৬:০৮ পিএম

সংসারে কখনো রান্নাঘরের ব্যস্ততা, আবার কখনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের তৈরি পোশাকের গল্প বলা। সেই সঙ্গে সন্তানদের লালন পালন। জীবন যেন তাকে একসঙ্গে অনেকগুলো পরিচয় দিয়েছে। আর প্রতিটি পরিচয়কেই আপন করে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তামান্না চাঁদনী।

তিনি শুধু একজন উদ্যোক্তা নন, নিজের স্বপ্নকে নিজের হাতেই বাস্তবে রূপ দেওয়া এক নারীর গল্প। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেছেন, দুই সন্তানের মা হয়েছেন, সংসার সামলেছেন—তারপরও থেমে থাকেননি। বরং নিজের ঘর থেকেই শুরু করেছেন ব্যবসা। আজ সেই ছোট্ট উদ্যোগই তাকে এনে দিয়েছে পরিচিতি, মানুষের আস্থা আর আর্থিক স্বনির্ভরতা।

তামান্না চাঁদনীর ব্যবসার নাম ‘আড়ঙ্গ’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই পেজকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তার ব্যবসায়িক জগৎ। জুয়েলারি -আংটি, চেইন, নেকলেসসহ দিয়ে শুরু হলেও এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের শাড়ি সহ বিভিন্ন ফ্যাশনপণ্য। পেজটির অনুসারী এখন ৪ লাখেরও বেশি। প্রতিদিনই আসে অসংখ্য অর্ডার। কিন্তু এই সাফল্যের গল্পের শুরুটা ছিল খুব সাধারণ।

মাত্র ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু:

২০১৮ সাল। হাতে ছিল মাত্র ২০ হাজার টাকা। সেই অর্থ দিয়েই দেশীয় বিভিন্ন গহনা বিক্রি শুরু করে তামান্না। বেচাকেনা শুরু হলেও সফলতার মুখ তখনো দেখেননি। ২০২০ সালে হঠাৎ কয়েকটি শাড়ি নিয়েও পরীক্ষামূলক ব্যবসা শুরু করেন। ফেসবুকে শাড়িগুলোর ছবি পোস্ট করতেই আসে অর্ডার। সেই অর্ডারই যেন তাকে দেখিয়ে দেয় এই পথেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

নিজের বাসা থেকেই ব্যবসার সবকিছু শুরু করেন তামান্না। কোনো শোরুম নেই, নেই আলাদা কোনো দোকান। ঘরের পরিসরই হয়ে ওঠে তার অফিস, স্টুডিও, গুদাম এবং ব্যবসার কেন্দ্র।

ছয় বছরের পথচলায় সেই ছোট উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে একটি সফল অনলাইন ব্যবসায়। প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করছেন তিনি। ব্যবসার আয় দিয়েই নিজের সংসার পরিচালনা করছেন।

জীবনের শুরুতেই দায়িত্ব:

তামান্না চাঁদনীর জীবনের গল্পটা অবশ্য আর দশজন উদ্যোক্তার মতো সরল নয়। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার বিয়ে হয়। দশম শ্রেণির প্রিটেস্ট পরীক্ষার আগেই মা হন তিনি। কিশোরী বয়সে কাঁধে এসে পড়ে সংসার ও মাতৃত্বের দায়িত্ব। কিন্তু তামান্না থামেননি।

সংসার করেছেন, সন্তান লালন-পালন করেছেন, আবার পড়াশোনাও চালিয়ে গেছেন। সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই শেষ করেছেন অনার্স এবং মাস্টার্স।

একদিকে মা, অন্যদিকে শিক্ষার্থী—এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উদ্যোক্তার পরিচয়। জীবনের প্রতিটি ধাপ যেন তাকে একটু একটু করে আরও দৃঢ় করেছে।

শাড়ি যেন শুধু পোশাক নয়, তার শিল্প:

তামান্নার ব্যবসার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার শাড়ির ডিজাইন ও উপস্থাপন। বাহারি ধরনের শাড়ি তিনি কারিগর দিয়ে তৈরি করান। নকশা থেকে শুরু করে রং, কাপড় কিংবা ডিজাইনের নানা খুঁটিনাটি—সবকিছুতেই থাকে তার নিজস্ব চিন্তার ছাপ।

একই ডিজাইনের শাড়ি বারবার তৈরি করতে চান না তিনি। তার লক্ষ্য—ক্রেতার হাতে এমন কিছু তুলে দেওয়া, যা অন্যদের থেকে আলাদা।

কেউ কোনো ডিজাইন অনুসরণ করলে সেটিকেও নিজের মতো করে পরিবর্তন করে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন তিনি। এভাবেই তৈরি করেন ইউনিক প্রোডাক্ট।

শুধু ডিজাইন করেই থেমে থাকেন না। নিজেই মডেল হন, নিজেই পণ্যের বর্ণনা দেন। তার কথা বলার ধরন, বাচনভঙ্গি এবং পণ্য উপস্থাপনের দক্ষতা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে।

তাকে দেখে অনেক সময় মনে হয়, একটি অনলাইন পেজ নয়, যেন নিজের হাতেই একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাশন হাউজ দাঁড় করিয়েছেন তিনি।

কারিগরদের দিয়ে পণ্য তৈরি করানো থেকে শুরু করে ডিজাইন, মডেলিং, প্রচার এবং ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যবসার প্রায় প্রতিটি ধাপেই তার সরাসরি সম্পৃক্ততা।

নিজের সাফল্যের সঙ্গে অন্য নারীদেরও পথ দেখানো:

তামান্নার সাফল্যের গল্প শুধু তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তার ব্যবসার সঙ্গে কাজ করছেন আরও তিনজন নারী। তাদেরও তিনি স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ নিজের জন্য তৈরি করা পথেই অন্য নারীদেরও হাঁটার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি।

নারীর অধিকার নিয়েও কাজ করেন তামান্না। তার বিশ্বাস, একজন নারী নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারলে শুধু তার নিজের জীবনই বদলায় না, বদলে যায় পুরো পরিবারের চিত্র। আর সেই আত্মনির্ভরতার শুরু হতে পারে নিজের পছন্দের কাজ থেকেই।

সংসার আর ব্যবসা—দুই-ই তার:

সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পরও তামান্না চাঁদনীর কাছে সংসার কখনো দ্বিতীয় হয়ে যায়নি। তার দুই সন্তান। মেয়ে ডাক্তারি পড়ছেন, ছেলে পড়ছে দশম শ্রেণিতে। সবকিছুর পাশাপাশি ব্যবসাও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

ব্যবসার ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানদের মানুষ করাই তার অন্যতম বড় চিন্তা।

তামান্না চাঁদনী জানান, তার স্বপ্ন, সন্তানদের ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করার পর ব্যবসাটিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া। একদিন একটি শোরুম দেওয়ার ইচ্ছাও আছে তার। হয়তো তখন ‘আড়ঙ্গ’ শুধু একটি ফেসবুক পেজ থাকবে না। হয়ে উঠবে তার দীর্ঘ পথচলার দৃশ্যমান ঠিকানা।

মানুষের আস্থাই সবচেয়ে বড় অর্জন:

ব্যবসায় লাভ করা সহজ হতে পারে, কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করা সহজ নয়। তামান্না সেই আস্থাকেই নিজের ব্যবসার সবচেয়ে বড় সম্পদ মনে করেন।

তিনি বলেন, আমার ব্যবসার নীতি হল মানসম্মত পণ্য দেওয়া, সততা বজায় রাখা এবং ক্রেতার বিশ্বাস ধরে রাখা।
বাজারদর বিশ্লেষণ করে সর্বোচ্চ মানের পণ্য দেওয়ার চেষ্টা করি। লাভের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম রাখার চেষ্টা করি।

তিনি জানান, তার কাছে একবার বেশি লাভ করার চেয়ে একজন ক্রেতার আস্থা অর্জন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ একজন সন্তুষ্ট ক্রেতা শুধু একবার ফিরে আসেন না, সঙ্গে করে নিয়ে আসেন আরও অনেক মানুষকে। এই আস্থাই ধীরে ধীরে তার ব্যবসাকে বড় করেছে।

‘নারীরা চাইলে সব করতে পারে’:

তামান্না চাঁদনীর গল্পে হয়তো সবচেয়ে বড় বার্তাটি লুকিয়ে আছে তার বিশ্বাসে।

তিনি মনে করেন, নারীদের ইচ্ছাশক্তি অনেক বেশি। প্রয়োজন শুধু নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা, পরিশ্রম করা এবং যে কাজটি ভালো লাগে, সেটিকে মন দিয়ে করা।

তার ভাষায়, নারীদের কারও ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের পছন্দের কাজে মনোযোগী হওয়া উচিত। পরিশ্রম, সততা এবং কাজের প্রতি নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থাকলে সফলতা আসবেই। তবে তার কাছে সফলতার অর্থ শুধু টাকা উপার্জন নয়। মানুষের আস্থা অর্জন করাও সফলতা।

তামান্না সেই আস্থাকেই নিজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। ছয় বছরের পথচলায় সেই চ্যালেঞ্জ তিনি অনেকটাই পেরিয়ে এসেছেন।

ঘর থেকেই যে স্বপ্নের শুরু:

এক হাতে সংসার, অন্য হাতে ব্যবসা। তার গল্প তাই শুধু একটি ফেসবুক পেজের সাফল্যের গল্প নয়। এটি ঘরের চার দেয়ালের ভেতর থেকেও একজন নারী কীভাবে নিজের জন্য একটি পৃথিবী তৈরি করতে পারেন, তার গল্প।

‘আড়ঙ্গ’-এর প্রতিটি শাড়িতে যেমন থাকে রং, নকশা আর সৌন্দর্য, তেমনি তামান্না চাঁদনীর জীবনের গল্পেও আছে সংগ্রাম, স্বপ্ন, দায়িত্ব আর অর্জনের নানা রং।

শূন্য থেকে শুরু করা সেই পথ আজ তাকে নিয়ে এসেছে লক্ষাধিক টাকার মাসিক আয়ের একজন সফল উদ্যোক্তার পরিচয়ে। তবে তার চোখ এখনো সামনে—সন্তানদের ভবিষ্যৎ, নিজের ব্যবসার আরও বড় পরিসর এবং আরও কিছু নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলার স্বপ্নে।

কারণ তামান্না চাঁদনীর কাছে সাফল্য মানে শুধু নিজের জন্য এগিয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজের সঙ্গে অন্য নারীদেরও এগিয়ে নেওয়া।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


তামান্নার আড়ঙ্গ: ঘর থেকে গড়ে ওঠা এক নারীর ফ্যাশন হাউজ

রায়হান আহমদ

প্রকাশিত: ২২ আগষ্ট ২০২৬ ১৬:০৮ পিএম

সংসারে কখনো রান্নাঘরের ব্যস্ততা, আবার কখনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের তৈরি পোশাকের গল্প বলা। সেই সঙ্গে সন্তানদের লালন পালন। জীবন যেন তাকে একসঙ্গে অনেকগুলো পরিচয় দিয়েছে। আর প্রতিটি পরিচয়কেই আপন করে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তামান্না চাঁদনী।

তিনি শুধু একজন উদ্যোক্তা নন, নিজের স্বপ্নকে নিজের হাতেই বাস্তবে রূপ দেওয়া এক নারীর গল্প। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেছেন, দুই সন্তানের মা হয়েছেন, সংসার সামলেছেন—তারপরও থেমে থাকেননি। বরং নিজের ঘর থেকেই শুরু করেছেন ব্যবসা। আজ সেই ছোট্ট উদ্যোগই তাকে এনে দিয়েছে পরিচিতি, মানুষের আস্থা আর আর্থিক স্বনির্ভরতা।

তামান্না চাঁদনীর ব্যবসার নাম ‘আড়ঙ্গ’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই পেজকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তার ব্যবসায়িক জগৎ। জুয়েলারি -আংটি, চেইন, নেকলেসসহ দিয়ে শুরু হলেও এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের শাড়ি সহ বিভিন্ন ফ্যাশনপণ্য। পেজটির অনুসারী এখন ৪ লাখেরও বেশি। প্রতিদিনই আসে অসংখ্য অর্ডার। কিন্তু এই সাফল্যের গল্পের শুরুটা ছিল খুব সাধারণ।

মাত্র ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু:

২০১৮ সাল। হাতে ছিল মাত্র ২০ হাজার টাকা। সেই অর্থ দিয়েই দেশীয় বিভিন্ন গহনা বিক্রি শুরু করে তামান্না। বেচাকেনা শুরু হলেও সফলতার মুখ তখনো দেখেননি। ২০২০ সালে হঠাৎ কয়েকটি শাড়ি নিয়েও পরীক্ষামূলক ব্যবসা শুরু করেন। ফেসবুকে শাড়িগুলোর ছবি পোস্ট করতেই আসে অর্ডার। সেই অর্ডারই যেন তাকে দেখিয়ে দেয় এই পথেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

নিজের বাসা থেকেই ব্যবসার সবকিছু শুরু করেন তামান্না। কোনো শোরুম নেই, নেই আলাদা কোনো দোকান। ঘরের পরিসরই হয়ে ওঠে তার অফিস, স্টুডিও, গুদাম এবং ব্যবসার কেন্দ্র।

ছয় বছরের পথচলায় সেই ছোট উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে একটি সফল অনলাইন ব্যবসায়। প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করছেন তিনি। ব্যবসার আয় দিয়েই নিজের সংসার পরিচালনা করছেন।

জীবনের শুরুতেই দায়িত্ব:

তামান্না চাঁদনীর জীবনের গল্পটা অবশ্য আর দশজন উদ্যোক্তার মতো সরল নয়। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার বিয়ে হয়। দশম শ্রেণির প্রিটেস্ট পরীক্ষার আগেই মা হন তিনি। কিশোরী বয়সে কাঁধে এসে পড়ে সংসার ও মাতৃত্বের দায়িত্ব। কিন্তু তামান্না থামেননি।

সংসার করেছেন, সন্তান লালন-পালন করেছেন, আবার পড়াশোনাও চালিয়ে গেছেন। সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই শেষ করেছেন অনার্স এবং মাস্টার্স।

একদিকে মা, অন্যদিকে শিক্ষার্থী—এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উদ্যোক্তার পরিচয়। জীবনের প্রতিটি ধাপ যেন তাকে একটু একটু করে আরও দৃঢ় করেছে।

শাড়ি যেন শুধু পোশাক নয়, তার শিল্প:

তামান্নার ব্যবসার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার শাড়ির ডিজাইন ও উপস্থাপন। বাহারি ধরনের শাড়ি তিনি কারিগর দিয়ে তৈরি করান। নকশা থেকে শুরু করে রং, কাপড় কিংবা ডিজাইনের নানা খুঁটিনাটি—সবকিছুতেই থাকে তার নিজস্ব চিন্তার ছাপ।

একই ডিজাইনের শাড়ি বারবার তৈরি করতে চান না তিনি। তার লক্ষ্য—ক্রেতার হাতে এমন কিছু তুলে দেওয়া, যা অন্যদের থেকে আলাদা।

কেউ কোনো ডিজাইন অনুসরণ করলে সেটিকেও নিজের মতো করে পরিবর্তন করে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন তিনি। এভাবেই তৈরি করেন ইউনিক প্রোডাক্ট।

শুধু ডিজাইন করেই থেমে থাকেন না। নিজেই মডেল হন, নিজেই পণ্যের বর্ণনা দেন। তার কথা বলার ধরন, বাচনভঙ্গি এবং পণ্য উপস্থাপনের দক্ষতা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে।

তাকে দেখে অনেক সময় মনে হয়, একটি অনলাইন পেজ নয়, যেন নিজের হাতেই একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাশন হাউজ দাঁড় করিয়েছেন তিনি।

কারিগরদের দিয়ে পণ্য তৈরি করানো থেকে শুরু করে ডিজাইন, মডেলিং, প্রচার এবং ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যবসার প্রায় প্রতিটি ধাপেই তার সরাসরি সম্পৃক্ততা।

নিজের সাফল্যের সঙ্গে অন্য নারীদেরও পথ দেখানো:

তামান্নার সাফল্যের গল্প শুধু তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তার ব্যবসার সঙ্গে কাজ করছেন আরও তিনজন নারী। তাদেরও তিনি স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ নিজের জন্য তৈরি করা পথেই অন্য নারীদেরও হাঁটার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি।

নারীর অধিকার নিয়েও কাজ করেন তামান্না। তার বিশ্বাস, একজন নারী নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারলে শুধু তার নিজের জীবনই বদলায় না, বদলে যায় পুরো পরিবারের চিত্র। আর সেই আত্মনির্ভরতার শুরু হতে পারে নিজের পছন্দের কাজ থেকেই।

সংসার আর ব্যবসা—দুই-ই তার:

সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পরও তামান্না চাঁদনীর কাছে সংসার কখনো দ্বিতীয় হয়ে যায়নি। তার দুই সন্তান। মেয়ে ডাক্তারি পড়ছেন, ছেলে পড়ছে দশম শ্রেণিতে। সবকিছুর পাশাপাশি ব্যবসাও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

ব্যবসার ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানদের মানুষ করাই তার অন্যতম বড় চিন্তা।

তামান্না চাঁদনী জানান, তার স্বপ্ন, সন্তানদের ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করার পর ব্যবসাটিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া। একদিন একটি শোরুম দেওয়ার ইচ্ছাও আছে তার। হয়তো তখন ‘আড়ঙ্গ’ শুধু একটি ফেসবুক পেজ থাকবে না। হয়ে উঠবে তার দীর্ঘ পথচলার দৃশ্যমান ঠিকানা।

মানুষের আস্থাই সবচেয়ে বড় অর্জন:

ব্যবসায় লাভ করা সহজ হতে পারে, কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করা সহজ নয়। তামান্না সেই আস্থাকেই নিজের ব্যবসার সবচেয়ে বড় সম্পদ মনে করেন।

তিনি বলেন, আমার ব্যবসার নীতি হল মানসম্মত পণ্য দেওয়া, সততা বজায় রাখা এবং ক্রেতার বিশ্বাস ধরে রাখা।
বাজারদর বিশ্লেষণ করে সর্বোচ্চ মানের পণ্য দেওয়ার চেষ্টা করি। লাভের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম রাখার চেষ্টা করি।

তিনি জানান, তার কাছে একবার বেশি লাভ করার চেয়ে একজন ক্রেতার আস্থা অর্জন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ একজন সন্তুষ্ট ক্রেতা শুধু একবার ফিরে আসেন না, সঙ্গে করে নিয়ে আসেন আরও অনেক মানুষকে। এই আস্থাই ধীরে ধীরে তার ব্যবসাকে বড় করেছে।

‘নারীরা চাইলে সব করতে পারে’:

তামান্না চাঁদনীর গল্পে হয়তো সবচেয়ে বড় বার্তাটি লুকিয়ে আছে তার বিশ্বাসে।

তিনি মনে করেন, নারীদের ইচ্ছাশক্তি অনেক বেশি। প্রয়োজন শুধু নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা, পরিশ্রম করা এবং যে কাজটি ভালো লাগে, সেটিকে মন দিয়ে করা।

তার ভাষায়, নারীদের কারও ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের পছন্দের কাজে মনোযোগী হওয়া উচিত। পরিশ্রম, সততা এবং কাজের প্রতি নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থাকলে সফলতা আসবেই। তবে তার কাছে সফলতার অর্থ শুধু টাকা উপার্জন নয়। মানুষের আস্থা অর্জন করাও সফলতা।

তামান্না সেই আস্থাকেই নিজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। ছয় বছরের পথচলায় সেই চ্যালেঞ্জ তিনি অনেকটাই পেরিয়ে এসেছেন।

ঘর থেকেই যে স্বপ্নের শুরু:

এক হাতে সংসার, অন্য হাতে ব্যবসা। তার গল্প তাই শুধু একটি ফেসবুক পেজের সাফল্যের গল্প নয়। এটি ঘরের চার দেয়ালের ভেতর থেকেও একজন নারী কীভাবে নিজের জন্য একটি পৃথিবী তৈরি করতে পারেন, তার গল্প।

‘আড়ঙ্গ’-এর প্রতিটি শাড়িতে যেমন থাকে রং, নকশা আর সৌন্দর্য, তেমনি তামান্না চাঁদনীর জীবনের গল্পেও আছে সংগ্রাম, স্বপ্ন, দায়িত্ব আর অর্জনের নানা রং।

শূন্য থেকে শুরু করা সেই পথ আজ তাকে নিয়ে এসেছে লক্ষাধিক টাকার মাসিক আয়ের একজন সফল উদ্যোক্তার পরিচয়ে। তবে তার চোখ এখনো সামনে—সন্তানদের ভবিষ্যৎ, নিজের ব্যবসার আরও বড় পরিসর এবং আরও কিছু নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলার স্বপ্নে।

কারণ তামান্না চাঁদনীর কাছে সাফল্য মানে শুধু নিজের জন্য এগিয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজের সঙ্গে অন্য নারীদেরও এগিয়ে নেওয়া।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর