infoamaderdin@gmail.com রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

পায়রা বন্দর

নাবিক পারাপারের আড়ালে চোরাই তেল-মাদকের সিন্ডিকেট, প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৯ জুলাই ২০২৬ ১৩:০৭ পিএম

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার পায়রা সমুদ্রবন্দর ও পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন এলাকায় পণ্যবাহী জাহাজের নাবিকদের তীরে পৌঁছে দেওয়ার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চোরাই জ্বালানি তেল ও মাদক পাচারের একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহাজ থেকে অবৈধভাবে তেল সংগ্রহ, মাদক সরবরাহ এবং সরকারি খাসজমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে এই চক্র কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছে।

স্থানীয় সূত্র ও দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে জানা যায়, ধানখালী এলাকায় অবস্থিত পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পরিবহনকারী একাধিক লাইটারেজ জাহাজ নিয়মিত পণ্য খালাস করে। অভিযোগ রয়েছে, এই জাহাজগুলোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় সিন্ডিকেটের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল পাচার করছেন। পরে সেই তেল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেটটি বিশেষভাবে তৈরি ছোট ফাইবার বোর্ড ব্যবহার করে নাবিকদের যাতায়াতের আড়ালে তেল পরিবহন করে। এসব বোর্ডে গোপন কেবিন তৈরি থাকায় একবারেই কয়েক হাজার লিটার তেল তীরে আনা সম্ভব হয়। পরে ব্যারেলে ভরে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জাহাজ থেকে প্রতি লিটার তেল ৭০ থেকে ৮০ টাকায় কিনে স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় ১০০ টাকায় বিক্রি করা হয়।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, জাহাজে কর্মরত কিছু মাদকাসক্ত ক্রুকে তেল সংগ্রহে সহযোগিতার বিনিময়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সরবরাহ করা হয়। শুধু অর্থ নয়, মাদক দিয়েও তাদের সন্তুষ্ট করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবে তেল ও মাদকের অবৈধ বাণিজ্য একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

সরেজমিনে ধানখালীর মরিচবুনিয়া এলাকার আরপিসিএল জেটি ঘাটসংলগ্ন সরকারি খাসজমিতে একাধিক টিনশেড স্থাপনা দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্থাপনায় চোরাই তেল মজুত করে পরে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। সরকারি জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের পেছনেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন। পায়রা সমুদ্রবন্দরের হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন শরীফ বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অভিযোগের বিষয়ে কোস্টগার্ডের নজরদারি আরও জোরদার করা হবে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অবহিত করা হবে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, সরকারি খাসজমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, থানা পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। তার ভাষ্য, সমুদ্রবন্দর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ডের। তবে থানা পুলিশ কয়েকটি তেলের চালান জব্দ করেছিল এবং পরে বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শনের পর সংশ্লিষ্টরা সেগুলো ফেরত নিয়ে যায়।

স্থানীয়দের দাবি, পায়রা বন্দর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অবৈধ তেল ও মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা না হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং অপরাধচক্রের বিস্তার আরও বাড়বে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


পায়রা বন্দর

নাবিক পারাপারের আড়ালে চোরাই তেল-মাদকের সিন্ডিকেট, প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই ২০২৬ ১৩:০৭ পিএম

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার পায়রা সমুদ্রবন্দর ও পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন এলাকায় পণ্যবাহী জাহাজের নাবিকদের তীরে পৌঁছে দেওয়ার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চোরাই জ্বালানি তেল ও মাদক পাচারের একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহাজ থেকে অবৈধভাবে তেল সংগ্রহ, মাদক সরবরাহ এবং সরকারি খাসজমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে এই চক্র কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছে।

স্থানীয় সূত্র ও দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে জানা যায়, ধানখালী এলাকায় অবস্থিত পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পরিবহনকারী একাধিক লাইটারেজ জাহাজ নিয়মিত পণ্য খালাস করে। অভিযোগ রয়েছে, এই জাহাজগুলোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় সিন্ডিকেটের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল পাচার করছেন। পরে সেই তেল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেটটি বিশেষভাবে তৈরি ছোট ফাইবার বোর্ড ব্যবহার করে নাবিকদের যাতায়াতের আড়ালে তেল পরিবহন করে। এসব বোর্ডে গোপন কেবিন তৈরি থাকায় একবারেই কয়েক হাজার লিটার তেল তীরে আনা সম্ভব হয়। পরে ব্যারেলে ভরে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জাহাজ থেকে প্রতি লিটার তেল ৭০ থেকে ৮০ টাকায় কিনে স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় ১০০ টাকায় বিক্রি করা হয়।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, জাহাজে কর্মরত কিছু মাদকাসক্ত ক্রুকে তেল সংগ্রহে সহযোগিতার বিনিময়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সরবরাহ করা হয়। শুধু অর্থ নয়, মাদক দিয়েও তাদের সন্তুষ্ট করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবে তেল ও মাদকের অবৈধ বাণিজ্য একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

সরেজমিনে ধানখালীর মরিচবুনিয়া এলাকার আরপিসিএল জেটি ঘাটসংলগ্ন সরকারি খাসজমিতে একাধিক টিনশেড স্থাপনা দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্থাপনায় চোরাই তেল মজুত করে পরে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। সরকারি জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের পেছনেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন। পায়রা সমুদ্রবন্দরের হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন শরীফ বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অভিযোগের বিষয়ে কোস্টগার্ডের নজরদারি আরও জোরদার করা হবে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অবহিত করা হবে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, সরকারি খাসজমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, থানা পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। তার ভাষ্য, সমুদ্রবন্দর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ডের। তবে থানা পুলিশ কয়েকটি তেলের চালান জব্দ করেছিল এবং পরে বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শনের পর সংশ্লিষ্টরা সেগুলো ফেরত নিয়ে যায়।

স্থানীয়দের দাবি, পায়রা বন্দর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অবৈধ তেল ও মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা না হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং অপরাধচক্রের বিস্তার আরও বাড়বে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর