infoamaderdin@gmail.com সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
২ ভাদ্র ১৪৩৩

শিক্ষার্থী বাছাই নিয়ে অভিযোগ, নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলকে শোকজ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৭ আগষ্ট ২০২৬ ২০:০৮ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: শিক্ষার্থী বাছাই করে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসকে শোকজ করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।

২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ৩৮২ শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে সবাই জিপিএ-৫ পেলেও ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ৬০১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১৯ জন এবার পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এ ঘটনায় টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে শিক্ষা বোর্ড।

রোববার (১৬ আগস্ট) মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা খানের সই করা চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষককে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তসহ সশরীরে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে বিষয়টিকে ‘অতীব জরুরি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বোর্ডের চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থী, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী, এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী এবং এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করা শিক্ষার্থীদের তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পাঠদান, বিভাগ ও অতিরিক্ত শ্রেণি শাখার অনুমতিপত্রও উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ার পেছনে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অভিযোগ ওঠে, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করলেও কম নম্বর বা কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় কিছু শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নজরে আসার পর অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর টেস্ট পরীক্ষার ফল, রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণের তথ্য যাচাই শুরু করে শিক্ষা বোর্ড।

চলতি বছর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ৩৭৬ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ৬ জনসহ মোট ৩৮২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছরও প্রতিষ্ঠানটির ৩২০ পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছিল।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬০১। তবে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩৮২ জন। অর্থাৎ নবম শ্রেণিতে নিবন্ধনের পর এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত ২১৯ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে এসএসসির ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের শতভাগ জিপিএ-৫-এর ফল ধরে রাখতেই টেস্ট পরীক্ষাকে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের অনেকে পরে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফল করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে টিসি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকে এবার ভালো ফল করেছে। নরসিংদী সানবীন স্কুলে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ঘোড়াদিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়া পাঁচজনের মধ্যে তিনজন এবং নরসিংদী মডেল স্কুলের চারজনের মধ্যে একজন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

এ বিষয়ে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলে পঞ্চম শ্রেণি থেকে পাঁচ বছর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসে পড়েছে। এসএসসি পরীক্ষার আগে টেস্ট পরীক্ষায় ঐচ্ছিক বিষয় জীববিজ্ঞানে ১২ নম্বর পাওয়ার পর তাকে টিসি দেওয়া হয়। পরে নরসিংদী সানবীন স্কুলে ভর্তি করার সময় ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তাঁর ছেলে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে বলেও জানান ওই অভিভাবক।

ওই অভিভাবকের দাবি, এসএসসি পরীক্ষার মাত্র দুই মাস আগে একজন শিক্ষার্থীকে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দিলে তার মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব পড়ে। তাঁর ছেলে তখন খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।

অন্য এক শিক্ষার্থী জানায়, সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। অষ্টম শ্রেণি থেকে ধাপে ধাপে শিক্ষার্থী বের করে দেওয়া শুরু হয় বলে তার অভিযোগ। স্কুলে খাতা কঠোরভাবে মূল্যায়ন এবং প্রশ্নও কঠিন করা হতো বলে দাবি করে সে। পরে অন্য স্কুলে গিয়ে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে বলেও জানায় ওই শিক্ষার্থী।

তবে নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল থেকে টিসি নিয়ে সানবীন স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া আরেক শিক্ষার্থী ভিন্ন কথা বলেছে। তার ভাষ্য, নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলের নিয়মকানুন কঠিন হলেও তাকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়নি। টেস্ট পরীক্ষায় পাস করতে না পারায় সে অন্য স্কুলে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে।

নরসিংদী সানবীন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মোমতাজ উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী তাঁদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিল। অঙ্গীকারনামা নিয়ে তাদের ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে ২৫ জন এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে।

তবে শিক্ষার্থী বাছাই করে ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন। তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনা ও বোর্ডের পরিপত্র অনুসরণ করেই টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় এ প্লাস না পেলে শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয় না—এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভুয়া ও মিথ্যা। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ নম্বর পেলেই শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী বা অভিভাবক যদি প্রমাণ করতে পারেন যে ৩৩ শতাংশ পাওয়ার পরও তাকে ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয়নি, তাহলে এ বিষয়ে যে শাস্তি হবে, তা তাঁরা মেনে নেবেন।

প্রধান শিক্ষক জানান, এবার মোট ৪৮৩ শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ৩৮২ জন পাস করেছে এবং ১০১ জন অকৃতকার্য হয়েছে। পাস করা শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করা হয়েছে এবং অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করা হয়নি। টেস্ট পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই ফরম পূরণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ না করার বিষয়ে বোর্ডের পরিপত্র রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সরকার ও শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করেই তাঁরা কাজ করেছেন। প্রতিষ্ঠানের ভালো ফলাফলের পেছনে কঠোর শৃঙ্খলা, নিয়মিত ক্লাস, অতিরিক্ত সময় ধরে পড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের নিবিড় তত্ত্বাবধান রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা খান বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থীকে শুধু এ প্লাস না পাওয়ার কারণে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ বোর্ডের নজরে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ডেকে বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন, টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল এবং এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলার পর বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন, টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল ও এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করেও শুধু এ প্লাস না পাওয়ার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ না দেওয়া হলে তা নিয়মবহির্ভূত। এমন অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


শিক্ষার্থী বাছাই নিয়ে অভিযোগ, নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলকে শোকজ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ আগষ্ট ২০২৬ ২০:০৮ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: শিক্ষার্থী বাছাই করে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসকে শোকজ করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।

২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ৩৮২ শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে সবাই জিপিএ-৫ পেলেও ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ৬০১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১৯ জন এবার পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এ ঘটনায় টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে শিক্ষা বোর্ড।

রোববার (১৬ আগস্ট) মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা খানের সই করা চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষককে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তসহ সশরীরে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে বিষয়টিকে ‘অতীব জরুরি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বোর্ডের চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থী, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী, এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী এবং এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করা শিক্ষার্থীদের তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পাঠদান, বিভাগ ও অতিরিক্ত শ্রেণি শাখার অনুমতিপত্রও উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ার পেছনে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অভিযোগ ওঠে, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করলেও কম নম্বর বা কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় কিছু শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নজরে আসার পর অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর টেস্ট পরীক্ষার ফল, রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণের তথ্য যাচাই শুরু করে শিক্ষা বোর্ড।

চলতি বছর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ৩৭৬ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ৬ জনসহ মোট ৩৮২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছরও প্রতিষ্ঠানটির ৩২০ পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছিল।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬০১। তবে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩৮২ জন। অর্থাৎ নবম শ্রেণিতে নিবন্ধনের পর এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত ২১৯ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে এসএসসির ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের শতভাগ জিপিএ-৫-এর ফল ধরে রাখতেই টেস্ট পরীক্ষাকে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের অনেকে পরে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফল করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে টিসি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকে এবার ভালো ফল করেছে। নরসিংদী সানবীন স্কুলে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ঘোড়াদিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়া পাঁচজনের মধ্যে তিনজন এবং নরসিংদী মডেল স্কুলের চারজনের মধ্যে একজন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

এ বিষয়ে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলে পঞ্চম শ্রেণি থেকে পাঁচ বছর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসে পড়েছে। এসএসসি পরীক্ষার আগে টেস্ট পরীক্ষায় ঐচ্ছিক বিষয় জীববিজ্ঞানে ১২ নম্বর পাওয়ার পর তাকে টিসি দেওয়া হয়। পরে নরসিংদী সানবীন স্কুলে ভর্তি করার সময় ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তাঁর ছেলে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে বলেও জানান ওই অভিভাবক।

ওই অভিভাবকের দাবি, এসএসসি পরীক্ষার মাত্র দুই মাস আগে একজন শিক্ষার্থীকে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দিলে তার মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব পড়ে। তাঁর ছেলে তখন খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।

অন্য এক শিক্ষার্থী জানায়, সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। অষ্টম শ্রেণি থেকে ধাপে ধাপে শিক্ষার্থী বের করে দেওয়া শুরু হয় বলে তার অভিযোগ। স্কুলে খাতা কঠোরভাবে মূল্যায়ন এবং প্রশ্নও কঠিন করা হতো বলে দাবি করে সে। পরে অন্য স্কুলে গিয়ে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে বলেও জানায় ওই শিক্ষার্থী।

তবে নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল থেকে টিসি নিয়ে সানবীন স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া আরেক শিক্ষার্থী ভিন্ন কথা বলেছে। তার ভাষ্য, নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলের নিয়মকানুন কঠিন হলেও তাকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়নি। টেস্ট পরীক্ষায় পাস করতে না পারায় সে অন্য স্কুলে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে।

নরসিংদী সানবীন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মোমতাজ উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী তাঁদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিল। অঙ্গীকারনামা নিয়ে তাদের ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে ২৫ জন এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে।

তবে শিক্ষার্থী বাছাই করে ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন। তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনা ও বোর্ডের পরিপত্র অনুসরণ করেই টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় এ প্লাস না পেলে শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয় না—এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভুয়া ও মিথ্যা। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ নম্বর পেলেই শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী বা অভিভাবক যদি প্রমাণ করতে পারেন যে ৩৩ শতাংশ পাওয়ার পরও তাকে ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয়নি, তাহলে এ বিষয়ে যে শাস্তি হবে, তা তাঁরা মেনে নেবেন।

প্রধান শিক্ষক জানান, এবার মোট ৪৮৩ শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ৩৮২ জন পাস করেছে এবং ১০১ জন অকৃতকার্য হয়েছে। পাস করা শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করা হয়েছে এবং অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করা হয়নি। টেস্ট পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই ফরম পূরণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ না করার বিষয়ে বোর্ডের পরিপত্র রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সরকার ও শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করেই তাঁরা কাজ করেছেন। প্রতিষ্ঠানের ভালো ফলাফলের পেছনে কঠোর শৃঙ্খলা, নিয়মিত ক্লাস, অতিরিক্ত সময় ধরে পড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের নিবিড় তত্ত্বাবধান রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা খান বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থীকে শুধু এ প্লাস না পাওয়ার কারণে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ বোর্ডের নজরে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ডেকে বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন, টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল এবং এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলার পর বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন, টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল ও এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করেও শুধু এ প্লাস না পাওয়ার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ না দেওয়া হলে তা নিয়মবহির্ভূত। এমন অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর