পাকিস্তানে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ, নতুন বিধিনিষেধে চরম সংকটে সংবাদমাধ্যম
পাকিস্তানে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর নতুন করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিকদের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপ দেশটিতে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আরও সংকুচিত করবে। বিশেষ করে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের চলাচল ও প্রতিবেদন তৈরিতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সরকার বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য নতুন ভ্রমণ নীতিমালা কার্যকর করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইসলামাবাদ, করাচি ও লাহোরের বাইরে কোনো এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ বা প্রতিবেদন করতে হলে সাংবাদিকদের আগে থেকেই সরকারি অনুমতি নিতে হবে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নির্বাচন নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যমের সংবাদ কাভারেজ বেড়ে যাওয়ার পরই এই বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে। একই সময়ে কাশ্মীরে অধিক রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে চলমান আন্দোলন ও বিক্ষোভ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকদের ওপর চাপ বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে।
পাকিস্তানের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের জন্য সরকারি অনুমতির বাধ্যবাধকতা সাংবাদিকদের জন্য একটি ভীতিকর বার্তা। এর মাধ্যমে সরকার সমালোচনামূলক বা সংবেদনশীল প্রতিবেদন নিরুৎসাহিত করতে চাইছে বলে অভিযোগ তাদের।
নিউইয়র্কভিত্তিক সাংবাদিক অধিকারবিষয়ক সংস্থা ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে)-এর তথ্যমতে, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে কর্মরত দুই স্বাধীন সাংবাদিককে গত ১ আগস্ট আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া ‘ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য’ প্রচারের অভিযোগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের একাধিক সাংবাদিককে আদালতে তলব করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
সম্প্রতি কাশ্মীরের নির্বাচন কাভার করা আল জাজিরার এক স্থানীয় সাংবাদিকের প্রতিবেদনেরও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছে পাকিস্তান সরকার। একই সঙ্গে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের কাশ্মীর এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের সিনিয়র সহযোগী পরিচালক প্যাট্রিসিয়া গোসম্যান বলেন, পাকিস্তানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার আগেই সীমিত ছিল। নতুন এই বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের সর্বশেষ সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১৫৩তম, যা দেশটির গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রতিফলন।
এদিকে পাকিস্তানের ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস সরকারের কাছে অবিলম্বে এই বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, সরকার যদি গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি সত্যিকারের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, তবে সাংবাদিকদের কাজের ওপর আরোপিত নতুন সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া উচিত।
তবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, নতুন নিয়ম কার্যকর হলেও বিদেশি সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রমে কোনো বাধা সৃষ্টি হবে না। সাংবাদিকদের জন্য দ্রুত ভ্রমণ অনুমতি (ট্রাভেল পাস) ইস্যুর লক্ষ্যে নতুন একটি ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে বলেও জানিয়েছে তারা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো ও পাকিস্তান বিশ্লেষক কামরান বুখারি বলেন, তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের এ ধরনের প্রচেষ্টা বর্তমান ডিজিটাল যুগে কার্যকর হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে তথ্য নিয়ন্ত্রণের পুরোনো কৌশল উল্টো নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ, ব্যাংক হিসাব জব্দ, সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ, সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুত করা এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তারের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশটির সম্পাদকদের সংগঠনও বর্তমান নীতিকে সংবাদমাধ্যমের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: