‘ওয়ান সিটি টু টাউনস’ পরিকল্পনায় জীবিকা হারানোর শঙ্কায় ২৪ হাজার কৃষক
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী টানেলকে কেন্দ্র করে আধুনিক শিল্প ও আবাসিক হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ‘ওয়ান সিটি টু টাউনস’ বা ‘এক নগর দুই শহর’ নামে প্রস্তাবিত এ পরিকল্পনায় ৭ হাজার ৩১৫ একর জমি ব্যবহারের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে আনোয়ারার প্রায় ৪২ শতাংশ কৃষিজমি হারিয়ে যেতে পারে। এতে সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২৪ হাজার ৮৩৩ মানুষ এবং ২৩ হাজার ৭৭৬ ক্ষুদ্র কৃষক জীবিকা সংকটে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সিডিএর আনোয়ারা অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান (২০২৫-৫০)-এর খসড়া পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পরিকল্পনার আওতায় উপজেলার ১ হাজার ৭৮২ একর কৃষিজমি শিল্প, আবাসিক ও অন্যান্য নগর ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে আনোয়ারায় ২৩ হাজার ৯৬৭টি কৃষি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ৯৯ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। সংখ্যায় এ কৃষকের পরিমাণ ২৩ হাজার ৭৭৬ জন।
কৃষিজমি কমে গেলে এসব ক্ষুদ্র কৃষকের বড় অংশ তাদের প্রধান বা একমাত্র জীবিকার উৎস হারাতে পারেন। একই সঙ্গে কৃষিকাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ২৪ হাজার ৮৩৩ মানুষের একটি বড় অংশকে পেশা পরিবর্তনের পথে যেতে হতে পারে। এর প্রভাব শুধু কৃষক পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; কৃষিনির্ভর স্থানীয় অর্থনীতি, কৃষিপণ্য পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও সংশ্লিষ্ট শ্রমবাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি কৃষিজমি হারানোর ঝুঁকি বৈরাগে
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় কৃষিজমি কমানোর সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে বৈরাগ ইউনিয়নে। বর্তমানে ইউনিয়নটিতে প্রায় ৪৯৪ একর কৃষিজমি রয়েছে। এর ৯৮ শতাংশ শিল্প ও সাধারণ নগর ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেখানে কৃষিজমির পরিমাণ কমে মাত্র ৯ একরে নেমে আসতে পারে।
এ ছাড়া চাতরী ইউনিয়নে ৫৪৬ একর এবং বারখাইন ইউনিয়নে ৩৪৮ একর কৃষিজমি কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। এসব এলাকায় কৃষিজমির বড় অংশ নগরায়ণ ও শিল্পায়নের আওতায় চলে গেলে স্থানীয় কৃষকদের জীবিকা এবং কৃষি উৎপাদন দুটিই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আনোয়ারা চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চল। উপজেলাটিতে ধান, শাকসবজি, ডালসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফসল উৎপাদিত হয়। বর্তমানে সেখানে ১১ হাজার ১৯৬ একর জমিতে আমন এবং ৯ হাজার ৬৪ একর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়। ফলে কৃষিজমির বড় অংশ শিল্প ও নগর ব্যবহারে চলে গেলে খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্পায়নে কর্মসংস্থানের আশা
তবে ‘ওয়ান সিটি টু টাউনস’ পরিকল্পনায় শিল্পায়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির কথাও বলা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ আনোয়ারার জনসংখ্যা ৭ লাখ ২৪ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
নতুন পরিকল্পনায় ৭৭৪ দশমিক ৪ একর জমিতে চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। এর পাশাপাশি শিল্প খাতের জন্য আরও ৫৫০ একর জমি বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। এসব শিল্প এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে সিডিএ।
অর্থাৎ একদিকে কৃষিজমি কমিয়ে শিল্প ও নগরায়ণের মাধ্যমে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, অন্যদিকে বর্তমানে কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। ফলে পরিকল্পনার সুফল ও সম্ভাব্য ক্ষতির মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তিন ফসলি জমি নিয়ে উদ্বেগ
কৃষিজমি হারানোর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা। আনোয়ারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামীম আহমদ সরকার বলেন, উপজেলার অধিকাংশ কৃষিজমি তিন ফসলি। ধানের পাশাপাশি এসব জমিতে ব্যাপকভাবে সবজি চাষ হয়। নতুন শহর বাস্তবায়িত হলে কৃষিজমির পরিমাণ আরও কমে যাবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পালও তিন ফসলি জমিতে নগর গড়ে তোলার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বিবেচনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় পরিবেশের পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে আনোয়ারায় শিল্প, আবাসন ও আধুনিক নগর গড়ে তোলার পরিকল্পনা চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। শিল্পাঞ্চল ও নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠলে কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে পরিকল্পনার বড় একটি অংশ যদি বর্তমানে আবাদযোগ্য জমিতে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তিন ফসলি জমি হারালে তা সহজে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। তাই নতুন নগর পরিকল্পনায় কৃষিজমি সংরক্ষণ, কৃষকদের পুনর্বাসন, বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি উঠছে।
‘ওয়ান সিটি টু টাউনস’ পরিকল্পনা আনোয়ারাকে শিল্প ও নগরের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর বাস্তবায়নে কৃষিজমি ও কৃষকের জীবিকার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। উন্নয়নের পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সমন্বিত পরিকল্পনা না হলে দীর্ঘমেয়াদে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: