‘সক্ষমতা নেই’ বলে ৫৪ বছর ধরে প্রতারণা, বন্দর হস্তান্তরে রাষ্ট্র ঝুঁকিতে: আনু মুহাম্মদ
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি হস্তান্তরের উদ্যোগ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের তরুণদের ‘আমাদের সক্ষমতা নেই’—এই যুক্তি দেখিয়ে গত ৫৪ বছর ধরে প্রতারণা করা হয়েছে। কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া কৌশলগত এই বন্দর অবকাঠামো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে তুলে দেওয়া হলে রাষ্ট্র বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মঙ্গলবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটি (এমসিআরএস) আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগের নামে আওয়ামী লীগ আমলে আলোচনায় আসা ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম আবারও সামনে আসা বর্তমান সরকারের জন্য লজ্জার বিষয়। তার ভাষ্য, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান মুখে থাকলেও বন্দরের আধিপত্য দখলের ক্ষেত্রে পুরোনো শক্তিরই উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলে তা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। এ সময় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মাতারবাড়ী প্রকল্পের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এসব উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কেউ নেই।
গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি নিয়ে বিতর্কটি শুধু ‘দেশি না বিদেশি’ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রকৃত হিসাব আড়ালে থেকে যাবে। মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন শর্তে, কত বছরের জন্য, কী ধরনের স্বচ্ছতায় এবং শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন দৈনিক আমার দেশ-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সোহাগ কুমার বিশ্বাস। এতে বলা হয়, এনসিটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত। টার্মিনাল নির্মাণে সরকারি বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি কুই গ্যান্ট্রি ক্রেন ও ৩৩টি আরটিজি যুক্ত করা হয়েছে। টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম বা টিওএসও সচল রয়েছে।
প্রবন্ধে দাবি করা হয়, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনসিটি ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। জার্মান পরামর্শকের নির্ধারিত ১১ লাখ টিইইউ সক্ষমতার তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের মে মাসে এক মাসেই টার্মিনালটি ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বলেও প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।
প্রবন্ধে এনসিটি হস্তান্তরের প্রস্তাবিত কাঠামোতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বিষয় তুলে ধরা হয়। প্রথমত, শুরুতে দায়িত্বকে ‘অপারেটর’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরে তা ‘কনসেশনিয়ার’-এ রূপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে মাশুল থেকে পাওয়া অর্থ সরাসরি বন্দরের হিসাবে জমা হওয়ার পরিবর্তে ভিন্ন কাঠামোয় প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট পার-টিইইউ রাজস্বের পরিবর্তে স্তরভিত্তিক রয়্যালটি কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ‘গড় আয়’ কত দেখানো হচ্ছে, তার ওপর বন্দরের প্রাপ্তির হার নির্ভর করতে পারে। তৃতীয়ত, ১৫ বছরের আর্থিক মডেলের ভিত্তিতে হিসাব তৈরি করা হলেও এখন ৩০ বছরের মেয়াদের দাবি সামনে এসেছে।
প্রবন্ধে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একই ১২০ ডলার আয়ের ভিত্তিতে প্রতি কনটেইনারে বন্দরের নিট প্রাপ্তি ৬৫ দশমিক ২৫ ডলার থেকে কমে ১৭ দশমিক ১৮ ডলারে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ প্রতি কনটেইনারে বন্দরের প্রাপ্তি প্রায় ৭৪ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতি কনটেইনারে ৪৮ দশমিক ০৭ ডলারের এই পার্থক্য বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা, ১৫ বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ৩০ বছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ হতে পারে বলে প্রবন্ধে হিসাব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে প্রস্তাবিত বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ২০৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে এই বিনিয়োগ কোন কোন খাতে করা হবে, সে বিষয়ে প্রবন্ধে স্পষ্টতা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, দেশীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিটি রাজস্ব ধাপে ৫ ডলার বেশি এবং অগ্রিম ফি হিসেবে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার প্রস্তাব করেছে। এ হিসাবে প্রতি টিইইউতে প্রস্তাবিত আয় ৯৮ দশমিক ৫০ ডলার, যা বিদেশি প্রস্তাবের সর্বোচ্চ সীমা ৯৭ দশমিক ৫০ ডলারের চেয়েও বেশি।
এ ছাড়া দর-কষাকষির পর্যায়ে ন্যূনতম কনসেশন ফি ৯৯ দশমিক ৫৪ ডলার থেকে কমিয়ে ৯৪ দশমিক ৯৬ ডলার করা হয়েছে বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়। শুধু এই সমন্বয়ের কারণেই বছরে প্রায় ৬৩ লাখ ডলারের রাজস্ব ছাড় দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রবন্ধে দাবি করা হয়, আদালত কেবল প্রক্রিয়ার বৈধতার বিষয়টি পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। চুক্তির আর্থিক ও অন্যান্য শর্ত আদালত পরীক্ষা করেননি, কারণ এসব শর্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
গোলটেবিলে আরও বলা হয়, আধুনিক কনটেইনার টার্মিনালের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু ক্রেন বা অন্যান্য যন্ত্রপাতি নয়, তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কার্গো ম্যানিফেস্ট, শিপার ও কনসাইনি সম্পর্কিত তথ্য, রপ্তানি প্রবাহ এবং বার্থিং সূচির মতো তথ্য যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি চিত্র কার্যত তার হাতে চলে যেতে পারে।
প্রবন্ধে ২০২৩ সালের নভেম্বরে আলোচ্য বৈশ্বিক অপারেটরের অস্ট্রেলিয়া কার্যক্রমে সাইবার হামলার ঘটনাও তুলে ধরা হয়। ওই হামলার কারণে চারটি বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং ৩০ হাজারের বেশি কনটেইনার আটকে পড়েছিল বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
একই অপারেটরকে এনসিটি ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল বা সিসিটি—দুটি প্রধান টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলে মাশুল ও বার্থিং অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের বিকল্প কমে যেতে পারে বলেও প্রবন্ধে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
গোলটেবিল থেকে কৌশলগত জাতীয় অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় সাত দফা প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, কোনো নির্দিষ্ট দেশি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে নয়, যেকোনো অপারেটরের ক্ষেত্রেই এসব নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে কৌশলগত জাতীয় অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি হস্তান্তর কেবল উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে করা, অযাচিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরাসরি আলোচনা না করা, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় কোম্পানির ন্যূনতম ৫১ শতাংশ মালিকানা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি অংশীদারের অংশ সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশে সীমিত রাখা।
এ ছাড়া প্রযুক্তি হস্তান্তর বাধ্যতামূলক করা, কনসেশন মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ বছরে সীমাবদ্ধ রাখা, প্রকৃত বিনিয়োগ ও বিনিয়োগ পরিশোধের সময়ের সঙ্গে মেয়াদ যুক্ত করা এবং একই অপারেটরকে একই বন্দরে একাধিক কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ না দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে নয়, কার্যত দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ার, লভ্যাংশের অধিকার ও পর্ষদের ভোটাধিকার—তিন ক্ষেত্রেই দেশীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীর পরিচয় প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।
তথ্য ও কৌশলগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমসহ সব পরিচালন তথ্যের মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে রাখা, দেশের ভেতরে তথ্য সংরক্ষণ, স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ ও নজরদারি অবকাঠামোর স্পষ্ট সীমা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে খসড়া শর্তাবলি প্রকাশ এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে তা উপস্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় এজেন্ট, অংশীদার ও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রকাশের কথাও বলা হয়েছে।
শ্রমিক ও দেশীয় শিল্পের স্বার্থে বিদ্যমান জনবলের চাকরি ও সেবাশর্ত সুরক্ষা, দেশীয় বার্থ অপারেটর ও সেবাদাতাদের কেবল সাবকন্ট্রাক্টর না বানিয়ে অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা এবং দেশীয় পতাকাবাহী ও ফিডার জাহাজের ক্ষেত্রে বার্থিংয়ে বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির শীর্ষ নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে তুলে দেওয়া হলে শ্রমিকদের আন্দোলন সামাল দেওয়া কঠিন হবে। শ্রমিকদের ধারণা, ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে লিজ দেওয়া হলে বন্দরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার হরণ হতে পারে।
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক বাতেন বিপ্লব। আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন মাওলানা ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. হারুন অর রশিদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফি রতন, গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ বিশ্বাস, ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি সায়েদুল হক নিশান, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর প্রেসিডেন্ট দিলীপ রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা রিতু এবং নাগরিক ঐক্যের সাংগঠনিক সম্পাদক সাকিব আনোয়ারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।
বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার প্রশ্নটি ‘দেশি না বিদেশি’—এত সরলভাবে দেখলে চলবে না। মূল প্রশ্ন হলো কোন শর্তে, কত বছরের জন্য, কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং শেষ পর্যন্ত কারা এর মাধ্যমে লাভবান হবে।
তাদের মতে, একটি ভুল দরপত্র বাতিল করা সম্ভব এবং একটি ভুল বিনিয়োগ পুনর্গঠনও করা যায়। কিন্তু ৩০ বছরের আন্তর্জাতিক কনসেশন চুক্তি হয়ে গেলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে দীর্ঘদিন আইনি লড়াই করতে হতে পারে। তাই চট্টগ্রাম বন্দর ও এনসিটি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব শর্ত প্রকাশ, জনস্বার্থ যাচাই এবং পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: