ঢাকা সিটি কলেজে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ: ১৯৮ শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ অবৈধ
রাজধানীর ধানমন্ডির ঐতিহ্যবাহী ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষক নিয়োগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম, জালিয়াতি এবং সরকারি বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)-এর সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদনে কলেজটির বিভিন্ন কার্যক্রমে গুরুতর অসঙ্গতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলেজের অনুমোদিত ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ সরকারি আইন, বিধিমালা ও নির্ধারিত নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গত নয় বছরের আর্থিক লেনদেনে প্রায় ২ কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূত সম্মানী প্রদান, ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯ টাকা নগদে ব্যয় এবং ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ৩১ লাখ ২৪ হাজার ৭৫৯ টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকির তথ্য উঠে এসেছে।
ডিআইএ এসব অনিয়মকে আর্থিক বিধির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
১০৫ শিক্ষকের নিয়োগে অনিয়ম
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা ২৮৮ জন। এর মধ্যে অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে ১৯৮টি। কিন্তু এই শিক্ষকদের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে।
প্রথম ১০০ জন শিক্ষকের নিয়োগে ১৯৮২ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হলেও নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এছাড়া পৃথক নিয়োগ কমিটি গঠন এবং গভর্নিং বডির বৈধ অনুমোদনের প্রয়োজনীয় প্রমাণও উপস্থাপন করতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক ও তিনজন সহকারী অধ্যাপকসহ পাঁচজন শিক্ষকের নিয়োগে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, সাক্ষাৎকার, নিয়োগ কমিটি কিংবা গভর্নিং বডির অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে এসব নিয়োগকে অবৈধ ও বিধিবহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডিআইএ।
নীতিমালা উপেক্ষা করে পদোন্নতি
অডিটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা উপেক্ষা করে অতিরিক্ত ৩৪ জন অধ্যাপক এবং ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপক পদে শিক্ষক পদায়ন করা হয়েছে। তাদের চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে, যা বিধিবহির্ভূত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর্থিক অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকি
ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার না করে নগদ অর্থ থেকেই ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯ টাকা ব্যয় করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। সরকারি বিধি অনুযায়ী, ব্যাংকে জমা না দিয়ে নগদ অর্থ ব্যয় করাকে সাময়িক আত্মসাতের শামিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এছাড়া একই সময়ে গভর্নিং বডির সদস্যদের নিয়মবহির্ভূতভাবে এক কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা সম্মানী দেওয়া হয়েছে। ডিআইএ জানিয়েছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্যদের এ ধরনের সম্মানী গ্রহণের কোনো বিধান নেই। তাই পুরো অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন কেনাকাটা, নির্মাণকাজ, বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য ব্যয়ে উৎসে ভ্যাট কর্তন না করায় ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ টাকা এবং পাবলিক পরীক্ষার সম্মানীর ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর না কাটায় ২ লাখ ৯২ হাজার ৬৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। সব মিলিয়ে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ৩১ লাখ ২৪ হাজার ৭৫৯ টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রশাসনিক নথি উপস্থাপনেও ব্যর্থতা
অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ১০ হাজার ৮১১ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত এই কলেজে পরিদর্শনের সময় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নথি ও একাডেমিক হিসাব অডিট টিমের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া কলেজটির বিরুদ্ধে চলমান একাধিক মামলার ব্যয় সংক্রান্ত কোনো হিসাব বা প্রমাণও অডিট টিমকে দেখানো হয়নি।
১৫ কার্যদিবসের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ
ডিআইএর অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেব ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুজ্জামান পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেন। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর এম. এম. সহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে কলেজ কর্তৃপক্ষকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সব অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রমাণসহ বিস্তারিত জবাব জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ডিআইএর পরিচালক প্রফেসর এম. এম. সহিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সততা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। অডিটে যেসব অনিয়ম উঠে এসেছে, তা সরকারি আইন ও নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি জানান, কলেজ কর্তৃপক্ষের জবাব ও উপস্থাপিত প্রমাণ পর্যালোচনার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: