এক মাস দেরিতে শেষ হচ্ছে চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হচ্ছে দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের তুলনায় প্রায় এক মাস দেরিতে। অন্য বোর্ডের শিক্ষার্থীরা যেখানে ইতোমধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেছেন, সেখানে চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীদের স্থগিত লিখিত পরীক্ষা এখনো বাকি।
এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের স্থগিত থাকা লিখিত পরীক্ষাগুলো আগামী ২০ আগস্ট শুরু হয়ে ৯ সেপ্টেম্বর শেষ হবে। অন্যদিকে দেশের অন্যান্য সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞান বিভাগের লিখিত পরীক্ষা ২ আগস্ট এবং মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষা ৮ আগস্ট শেষ হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম পরীক্ষা ৮ আগস্ট এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে ১ আগস্ট।
ফলে চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে অন্য বোর্ডের শিক্ষার্থীদের তুলনায় অন্তত কয়েক সপ্তাহ কম সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি ইতোমধ্যে ঘোষণা হওয়ায় এ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
২০২৬–২৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে অনলাইন আবেদন শুরু হবে আগামী ১১ নভেম্বর। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা ১২ ডিসেম্বর, কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের পরীক্ষা ১৯ ডিসেম্বর, চারুকলা ইউনিটের পরীক্ষা ২২ ডিসেম্বর এবং ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটের পরীক্ষা ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। আইবিএ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা হবে ৫ ডিসেম্বর।
অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬–২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার সূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। ইউনিট-এ-এর পরীক্ষা ১ জানুয়ারি ২০২৭, ইউনিট-ই ৮ জানুয়ারি, ইউনিট-বি ১৫ জানুয়ারি, ইউনিট-সি ২২ জানুয়ারি এবং ইউনিট-ডি-এর পরীক্ষা ২৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। সব পরীক্ষা সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ঢাকায় নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এইচএসসি পরীক্ষা দীর্ঘ সময় পিছিয়ে যাওয়ায় তাঁরা অন্য বোর্ডের শিক্ষার্থীদের তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী শেখ রাহাদ বলেন, স্থগিত পরীক্ষা পেছানোয় তাঁদের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে প্রভাব পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আসনের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা হয়। পরীক্ষার যত দিন পেছানো হয়েছে, তাঁরা তত দিন অন্য বোর্ডের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে গেছেন। তাই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সময় বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
কক্সবাজার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। এখন পরীক্ষা শেষ করতে গিয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়ছেন। অন্য বোর্ডের শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পেলেও তাঁরা এখনো বোর্ড পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। এতে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
শিক্ষার্থী সাকিব চৌধুরীর দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কারণ অন্যদের তুলনায় তাঁদের প্রস্তুতির সময় কম।
এ বিষয়ে মহাজনহাট ফজলুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক কুতুব উদ্দিন তুষার বলেন, বোর্ড পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়টি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীরা এই সময়ের একটি বড় অংশ হারিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের বিষয়টি বিবেচনা করে অন্তত এক মাস সময় বাড়ালে তাঁরা ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারবেন।
একই কলেজের পরীক্ষার্থী সাব্বির হোসেন বলেন, যথাসময়ে পরীক্ষা শেষ হলে অন্য বোর্ডের শিক্ষার্থীদের মতো তাঁরাও ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পেতেন। এখন সেই সময় না পাওয়ায় তাঁরা চিন্তিত। শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
নিজামপুর সরকারি কলেজের পরীক্ষার্থী নওশীদ জাহানও একই দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ভর্তি পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির সময় শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ায় তাঁদের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে আশা করেন তিনি।
এদিকে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ডের সভাপতি ও ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, বিশেষ কারণেই চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন সেই বিষয়টি মাথায় রেখে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত হবে না। বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি প্রক্রিয়াটি আরও সমন্বিত ও সমানভাবে পরিচালনা করা যায়।
তবে শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচিতে পরিবর্তন আনার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দুইভাবে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের মতো পৃথক ভর্তি পরীক্ষা নেয়, আবার কিছু বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়।
চট্টগ্রামে এইচএসসি দেরিতে শেষ হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তনের কোনো চিন্তা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ইউজিসিও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। এই মুহূর্তে কমিশনের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তাভাবনা নেই। গুরুতর উদ্বেগ বা সমস্যা তৈরি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চলতি বছর নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৯২ হাজার ৯০৫ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার পরীক্ষার্থী ৯৯ হাজার ৬৮৮ জন। তাঁরা ১১৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।
জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি, পরীক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এবং সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার দুর্ভোগ বিবেচনায় ৮ জুলাই পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে ১৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও পরে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
পরিস্থিতির উন্নতি হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর ২৩ জুলাই স্থগিত থাকা পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর নিয়মিত সূচি অনুযায়ী কিছু পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও স্থগিতাদেশের আগে অনুষ্ঠিত কয়েকটি পরীক্ষা পরবর্তী সময়ে নতুন সময়সূচি অনুযায়ী পুনরায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সর্বশেষ সংশোধিত সূচি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বোর্ডের স্থগিত লিখিত পরীক্ষা ২০ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে ৯ সেপ্টেম্বর শেষ হবে।
ফলে চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থীকে এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেই দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে নামতে হবে। অন্যদিকে দেশের অন্যান্য বোর্ডের শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময় পেয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচিতে সমন্বয় করা হবে কি না, নাকি চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীদের সীমিত সময়ের মধ্যেই প্রতিযোগিতায় নামতে হবে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: