২ হাজার টাকার বিল ৭ হাজার, প্রিপেইড মিটারে ‘ভূতুড়ে’ বিলের অভিযোগ
রাজধানীতে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) প্রিপেইড মিটারে অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগে ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা। অনেকের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেশি বিল আসছে। অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ নিয়ে প্রতিদিন বনশ্রী ও মালিবাগের ডিপিডিসি কার্যালয়ে ভিড় করছেন গ্রাহকেরা।
সত্তোরোর্ধ্ব আজহারুল হক প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিল দিতেন প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু চলতি মাসে তার বিল এসেছে ৭ হাজার ২৯৮ টাকা। এত বেশি বিলের কারণ জানতে রাজধানীর বনশ্রীতে ডিপিডিসির কার্যালয়ে ছুটে আসতে হয়েছে তাকে।
বয়সের ভারে ঠিকমতো হাঁটতে ও কথা বলতে কষ্ট হলেও হাতে বিদ্যুৎ বিলের কাগজ নিয়ে কার্যালয়ে যান আজহারুল হক। কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানানোর পর মিটার পরীক্ষা করতে তার সঙ্গে একজন লাইনম্যানকে পাঠানো হয়।
আজহারুল হক বলেন, কখনোই তার বিদ্যুৎ বিল ২ হাজার ২০০ টাকার বেশি আসেনি। অথচ গত দুই মাস ধরে বিল তিন গুণেরও বেশি এসেছে। আগে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করতেন, এখনো একই পরিমাণ ব্যবহার করছেন। এত টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
একই অভিযোগ নিয়ে ডিপিডিসির বনশ্রী কার্যালয়ে আসেন হাবিবা বেগম। তার বাসায় তিনটি লাইট, দুটি ফ্যান ও একটি ফ্রিজ রয়েছে। এসব ব্যবহারে আগে মাসে বিদ্যুৎ বিল আসত ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। কিন্তু চলতি মাসে তার বিল দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৪৭ টাকা।
প্রায় চার গুণ বেশি বিল আসায় ক্ষুব্ধ হাবিবা বেগম লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি জানান, আগের মাসেও বিল অস্বাভাবিক বেশি এসেছিল। এবার আরও বেশি বিল আসায় তিনি মিটার পরীক্ষা করার জন্য আবেদন করেছেন।
ডিপিডিসির বনশ্রী কার্যালয়ের কো-অর্ডিনেটর হাসান জানান, প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ জন গ্রাহক অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ নিয়ে কার্যালয়ে আসছেন। তাদের অভিযোগের প্রায় সবই প্রিপেইড মিটারসংক্রান্ত। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।
তার দাবি, কোনো ধরনের মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা বা পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই প্রিপেইড মিটার চালু করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় নেটওয়ার্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নেটওয়ার্কজনিত ত্রুটির কারণে গ্রাহকেরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন বলে জানান তিনি।
গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রিপেইড মিটার চালুর পর বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রকৃত হিসাব নিয়ে তারা বিভ্রান্তিতে পড়ছেন। অনেকের দাবি, বাসায় আগের মতোই বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও বিল বা রিচার্জের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। স্থানীয় ডিপিডিসি কার্যালয়ে অভিযোগ জানিয়েও দ্রুত সমাধান না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে।
ডিপিডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রিপেইড মিটারের নেটওয়ার্কজনিত সমস্যার পাশাপাশি বিদ্যুতের ইউনিটভিত্তিক মূল্যহারও গ্রাহকের বিল বাড়ার অন্যতম কারণ। আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ব্যবহারের পরিমাণ অনুযায়ী বিদ্যুতের ইউনিটের দাম ধাপে ধাপে বাড়ে।
বর্তমান হিসাবে আবাসিক গ্রাহকদের প্রথম ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিটের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা। ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৫০ পয়সা, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ৯ টাকা ১০ পয়সা, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ৯ টাকা ৬২ পয়সা, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে প্রতি ইউনিটের দাম ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা।
ডিপিডিসির এক কর্মকর্তা বলেন, বাসায় এসি, ফ্রিজসহ একাধিক বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করলে মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার দ্রুত বাড়তে পারে। ফলে উচ্চতর ধাপের ইউনিট মূল্য কার্যকর হওয়ায় মোট বিলও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে ডিপিডিসির মালিবাগ কার্যালয়েও। সেখানেও প্রতিদিন অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ নিয়ে গ্রাহকদের ভিড় হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, গ্রাহকেরা নিয়মিত বাড়তি বিলের অভিযোগ নিয়ে আসছেন। কর্মকর্তারা তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন এবং বিষয়টি বিভিন্ন সমন্বয় সভায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হচ্ছে। তবে এখনো দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের চাপে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও বয়স্ক গ্রাহকেরা। অনেকেই বলছেন, মাসিক আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতেন। কিন্তু হঠাৎ কয়েক গুণ বেশি বিল আসায় তাদের সংসারের অন্যান্য খরচ কমিয়ে বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সামগ্রিক সংকট নিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে সংকট রয়েছে। এই সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়; পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।
গ্রাহকদের দাবি, বিদ্যুতের মূল্যহার ও ব্যবহারজনিত খরচের বিষয়টি আলাদা হলেও মিটারে কারিগরি ত্রুটির কারণে যদি ভুল হিসাব হয়, তাহলে দ্রুত তা শনাক্ত করে সংশোধন করতে হবে। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য কার্যকর গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রিপেইড মিটারে অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে সমাধান করা না হলে গ্রাহকদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত ব্যবহারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল আসার অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে মিটার, নেটওয়ার্ক ও বিলিং ব্যবস্থার ত্রুটি শনাক্ত করা জরুরি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: