infoamaderdin@gmail.com মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

জ্বর হলেই ডেঙ্গু পরীক্ষা, জাতীয় গাইডলাইন মানার নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৪:০৯ পিএম

দেশে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। আক্রান্তের পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মধ্যে। বিশেষ করে দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ায় অনেক রোগী দ্রুত জটিল অবস্থায় চলে যাচ্ছেন। একপর্যায়ে দেখা দিচ্ছে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমসহ প্রাণঘাতী নানা জটিলতা।

এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু মৌসুমে জ্বর হলেই দ্রুত পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ডেঙ্গু শনাক্ত হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখন ডেঙ্গুর পিক টাইমে প্রবেশ করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে দেশে হাম ও ডেঙ্গু—দুই রোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে জ্বর নিয়ে আসা রোগীদের বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে। ডেঙ্গু থেকে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত রোগী যেন হাসপাতাল ত্যাগ না করেন, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সব হাসপাতালেই জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরে সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে আনুপাতিক হারে মৃত্যুও বাড়তে পারে। ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নভেম্বর পর্যন্ত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে কমিউনিটি ও প্রান্তিক পর্যায়ে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করার ওপর। শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা গেলে রোগী কয়েক দিন বিশ্রাম নিতে পারবেন এবং গুরুতর শারীরিক জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, ডেঙ্গুর লক্ষণে পরিবর্তন এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে মাত্র এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ছে। তাই জ্বর আসার প্রথম দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এনএস-১ পরীক্ষা করে দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্ত করা জরুরি। প্রান্তিক ও কমিউনিটি পর্যায়ে বিনামূল্যে পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষ দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আসবেন।

তার মতে, জটিল রোগী ছাড়া অন্য ডেঙ্গু রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, রেলওয়ে ও সিটি করপোরেশনের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত। এতে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং ঢাকার বাইরে থেকে রোগী নিয়ে আসার প্রবণতাও কমবে।

বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু যত দ্রুত শনাক্ত করা যাবে, রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে গুরুতর জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

তিনি বলেন, আগে কয়েক দিন টানা উচ্চমাত্রার জ্বর থাকার পর শারীরিক জটিলতা দেখা দিত। কিন্তু বর্তমানে অনেক রোগীর মাত্র এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই দ্রুত অবনতি হচ্ছে। এমনকি অনেক সময় উচ্চমাত্রার জ্বরও থাকছে না। তাই ডেঙ্গু মৌসুমে জ্বর আসামাত্র কোনো ধরনের অবহেলা না করে পরীক্ষা করানো জরুরি।

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর পরামর্শ, জ্বর শুরুর দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এনএস-১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করালে দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্ত করা সম্ভব। শুরুতেই রোগ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া গেলে মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা নয়, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী জানিয়েছেন, দেশে ডেঙ্গুর হটস্পট চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, হটস্পট শনাক্ত করার পর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার জনবল এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে চলতি মৌসুমে জ্বর আসামাত্র ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।

এদিকে চলতি বছর ডেঙ্গুর ডেন-৩ সেরোটাইপের আধিক্য থাকলেও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ। তার মতে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের সর্বশেষ জাতীয় গাইডলাইন তৈরির সময়ও ডেন-২-এর পাশাপাশি ডেন-৩ সেরোটাইপের উপস্থিতি ছিল। ফলে ওই জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করেই বর্তমান ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় নির্দেশিকা পঞ্চম সংস্করণ, ২০২৫-এ ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এতে ডেঙ্গুর পুরো রোগপ্রবাহকে জ্বরের পর্যায়, সংকটকালীন বা তরল নিঃসরণের পর্যায় এবং সুস্থ হওয়ার পর্যায়—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, জ্বরের তৃতীয় থেকে চতুর্থ দিনের দিকে শরীরে রক্তরস বা প্লাজমা নিঃসরণের কারণে শক হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ সময় রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত তরল বা স্যালাইন দিলে ফুসফুসে পানি জমে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই ডেঙ্গু রোগীর তরল ব্যবস্থাপনায় বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনা রয়েছে।

ডেঙ্গু রোগীর জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণে প্যারাসিটামল ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। নির্দেশিকায় দৈনিক সর্বোচ্চ ৩ গ্রাম প্যারাসিটামল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যথানাশক ওষুধ ও স্টেরয়েড ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ভুল ওষুধ ব্যবহারে অভ্যন্তরীণ রক্তপাতসহ গুরুতর জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

জাতীয় নির্দেশিকায় সংক্রমণের প্রথম পাঁচ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রক্ত পরীক্ষা বা সিবিসি, হেমাটোক্রিট এবং এনএস-১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাঁচ দিন পার হলে আইজিএম ও আইজিজি অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শ্বেত রক্তকণিকা ও প্লাটিলেট কমে যাওয়া এবং হেমাটোক্রিট ২০ শতাংশ বা তার বেশি বেড়ে যাওয়াকে গুরুতর জটিলতার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা। বিশেষ করে বর্তমান মৌসুমে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতির প্রবণতা দেখা যাওয়ায় জ্বরকে সাধারণ অসুস্থতা হিসেবে না দেখে দ্রুত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত মশারি ব্যবহার এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। ফলে এই দুই মাসে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, জাতীয় গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস—এই তিন ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা না গেলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


জ্বর হলেই ডেঙ্গু পরীক্ষা, জাতীয় গাইডলাইন মানার নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৪:০৯ পিএম

দেশে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। আক্রান্তের পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মধ্যে। বিশেষ করে দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ায় অনেক রোগী দ্রুত জটিল অবস্থায় চলে যাচ্ছেন। একপর্যায়ে দেখা দিচ্ছে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমসহ প্রাণঘাতী নানা জটিলতা।

এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু মৌসুমে জ্বর হলেই দ্রুত পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ডেঙ্গু শনাক্ত হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখন ডেঙ্গুর পিক টাইমে প্রবেশ করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে দেশে হাম ও ডেঙ্গু—দুই রোগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে জ্বর নিয়ে আসা রোগীদের বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে। ডেঙ্গু থেকে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত রোগী যেন হাসপাতাল ত্যাগ না করেন, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সব হাসপাতালেই জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরে সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে আনুপাতিক হারে মৃত্যুও বাড়তে পারে। ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নভেম্বর পর্যন্ত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে কমিউনিটি ও প্রান্তিক পর্যায়ে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করার ওপর। শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা গেলে রোগী কয়েক দিন বিশ্রাম নিতে পারবেন এবং গুরুতর শারীরিক জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, ডেঙ্গুর লক্ষণে পরিবর্তন এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে মাত্র এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ছে। তাই জ্বর আসার প্রথম দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এনএস-১ পরীক্ষা করে দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্ত করা জরুরি। প্রান্তিক ও কমিউনিটি পর্যায়ে বিনামূল্যে পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষ দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আসবেন।

তার মতে, জটিল রোগী ছাড়া অন্য ডেঙ্গু রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, রেলওয়ে ও সিটি করপোরেশনের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত। এতে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং ঢাকার বাইরে থেকে রোগী নিয়ে আসার প্রবণতাও কমবে।

বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু যত দ্রুত শনাক্ত করা যাবে, রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে গুরুতর জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

তিনি বলেন, আগে কয়েক দিন টানা উচ্চমাত্রার জ্বর থাকার পর শারীরিক জটিলতা দেখা দিত। কিন্তু বর্তমানে অনেক রোগীর মাত্র এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই দ্রুত অবনতি হচ্ছে। এমনকি অনেক সময় উচ্চমাত্রার জ্বরও থাকছে না। তাই ডেঙ্গু মৌসুমে জ্বর আসামাত্র কোনো ধরনের অবহেলা না করে পরীক্ষা করানো জরুরি।

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর পরামর্শ, জ্বর শুরুর দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এনএস-১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করালে দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্ত করা সম্ভব। শুরুতেই রোগ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া গেলে মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা নয়, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী জানিয়েছেন, দেশে ডেঙ্গুর হটস্পট চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, হটস্পট শনাক্ত করার পর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার জনবল এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে চলতি মৌসুমে জ্বর আসামাত্র ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।

এদিকে চলতি বছর ডেঙ্গুর ডেন-৩ সেরোটাইপের আধিক্য থাকলেও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ। তার মতে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের সর্বশেষ জাতীয় গাইডলাইন তৈরির সময়ও ডেন-২-এর পাশাপাশি ডেন-৩ সেরোটাইপের উপস্থিতি ছিল। ফলে ওই জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করেই বর্তমান ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় নির্দেশিকা পঞ্চম সংস্করণ, ২০২৫-এ ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এতে ডেঙ্গুর পুরো রোগপ্রবাহকে জ্বরের পর্যায়, সংকটকালীন বা তরল নিঃসরণের পর্যায় এবং সুস্থ হওয়ার পর্যায়—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, জ্বরের তৃতীয় থেকে চতুর্থ দিনের দিকে শরীরে রক্তরস বা প্লাজমা নিঃসরণের কারণে শক হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ সময় রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত তরল বা স্যালাইন দিলে ফুসফুসে পানি জমে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই ডেঙ্গু রোগীর তরল ব্যবস্থাপনায় বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনা রয়েছে।

ডেঙ্গু রোগীর জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণে প্যারাসিটামল ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। নির্দেশিকায় দৈনিক সর্বোচ্চ ৩ গ্রাম প্যারাসিটামল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যথানাশক ওষুধ ও স্টেরয়েড ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ভুল ওষুধ ব্যবহারে অভ্যন্তরীণ রক্তপাতসহ গুরুতর জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

জাতীয় নির্দেশিকায় সংক্রমণের প্রথম পাঁচ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রক্ত পরীক্ষা বা সিবিসি, হেমাটোক্রিট এবং এনএস-১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাঁচ দিন পার হলে আইজিএম ও আইজিজি অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শ্বেত রক্তকণিকা ও প্লাটিলেট কমে যাওয়া এবং হেমাটোক্রিট ২০ শতাংশ বা তার বেশি বেড়ে যাওয়াকে গুরুতর জটিলতার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা। বিশেষ করে বর্তমান মৌসুমে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতির প্রবণতা দেখা যাওয়ায় জ্বরকে সাধারণ অসুস্থতা হিসেবে না দেখে দ্রুত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত মশারি ব্যবহার এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। ফলে এই দুই মাসে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, জাতীয় গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস—এই তিন ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা না গেলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর