infoamaderdin@gmail.com রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
৮ ভাদ্র ১৪৩৩

অনলাইন ব্যবসায় বাড়ছে এআই-নির্ভর প্রতারণার ঝুঁকি

নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত: ২৩ আগষ্ট ২০২৬ ২১:০৮ পিএম

এআই প্রযুক্তির অন্ধকার দিক ক্রমেই প্রাকাশ্যে আসতে শরু করেছে। এই প্রযুক্তি নির্ভর করে গড়ে উঠেছে প্রতারক চক্র। যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করে ব্যবসায় বিনিয়োগ, প্রেমের সম্পর্ক, চাকরি ও বিভিন্ন আর্থিক সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিনিধি ডেলফিন শানৎস বলেন, ‘এআই ব্যবহারের কারণে প্রতারণা চক্রগুলোর পরিচালন ব্যয় অনেকটা কমে গেছে। প্রতারকরা এআই দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করতে পারে। এমনকি ওই ব্যক্তির ভাষায় কথা বলাও সম্ভব হচ্ছে। এতে কম জনবল ব্যবহার করে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে।’

এআই অপরাধীদের ভুয়া ছবি, কণ্ঠস্বর ও পরিচয় তৈরির সুযোগ দিচ্ছে। ভিডিও কলে ব্যাংক বা পুলিশের কার্যালয়ের মতো কৃত্রিম পটভূমিও তৈরি করা যায়। বাস্তব মানুষের ছবি ও কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে ভুয়া ব্যক্তিও তৈরি করা সম্ভব। ফলে কোনো ভিডিও কল আসল নাকি কৃত্রিম তা অনেক সময় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অনলাইন প্রতারণায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ প্রতারণাসহ তিন ধরনের অনলাইন প্রতারণায় দেশটিতে বার্ষিক ক্ষতি ২০২১-২৫ সালের মধ্যে প্রায় চার গুণ বেড়ে ১ হাজার ৩০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

জাপানেও এ আর্থিক ক্ষতি পরিমাণ বেড়েছে। দেশটির জাতীয় পুলিশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনিয়োগ প্রতারণা, প্রেমের সম্পর্কের নামে প্রতারণা ও ফোনে প্রতারণার মতো ঘটনায় গত এক বছরে লোকসান প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইয়েনে (প্রায় ২০৬ কোটি ডলার)।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এরপর মার্কিন বিচার বিভাগ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় বড় ধরনের অভিযান চালায়। এতে ১৪ লাখের বেশি ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে অপরাধমূলক কার্যক্রম বন্ধ করা হয়।

কম্বোডিয়াও প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে বড় অভিযান চালিয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার বিদেশী নাগরিককে প্রতারণায় জড়িত থাকার সন্দেহে বহিষ্কার করেছে। জুনে রাজধানী নমপেনে পাঁচদিনের অভিযানে ১০১টি সন্দেহভাজন প্রতারণা কেন্দ্রে অভিযান চালানো হয়। এতে প্রায় দুই হাজার বিদেশীকে লক্ষ্য করা হয়। একটি বিলাসবহুল হোটেল থেকে ২৩ জন চীনা ও একজন মালয়েশীয় নাগরিককে আটক করা হয়। জব্দ করা হয় প্রায় ৭০০টি মুঠোফোন।

মিয়ানমারও চীনের অনুরোধে প্রতারণায় জড়িত সন্দেহে সাড়ে সাত হাজারের বেশি চীনা নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। তবে অভিযান জোরদার হলেও প্রতারণা চক্র পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। তারা ছোট ও কম পরিচিত জায়গায় ঘাঁটি সরিয়ে নিচ্ছে। আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট ও হোটেল কক্ষও ব্যবহার করছে। কেউ কেউ অন্য দেশেও চলে যাচ্ছে।

শ্রীলংকা এখন এমন একটি নতুন গন্তব্য হয়ে উঠেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) প্রতারণার সন্দেহে এক হাজারের বেশি বিদেশী নাগরিককে আটক করেছে। এ সংখ্যা ২০২৪ সালের পুরো বছরের আটকের সংখ্যার চেয়েও বেশি। চীনের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কিছু আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শ্রীলংকায় ঘাঁটি সরিয়েছে।

ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব তিমুরেও অভিযান চলছে। জুলাইয়ে পূর্ব তিমুরের রাজধানী দিলিতে এক জাপানি ও এক চীনা নাগরিককে আটক করা হয়। তারা একটি হোটেলকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে স্টারলিংক উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রতারণা চালাতেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। জুন ও জুলাইয়ের অভিযানে চীন, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩৫০ বিদেশীকে আটক করা হয়। প্রতারণা চক্র চুরি করা অর্থ দ্রুত বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। এতে অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা ও তা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

জাপান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান গবেষক ইয়োশিমাসা মরিগুচি বলেন, ‘এ অপরাধ ঠেকাতে বিভিন্ন দেশের সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি এআই ব্যবহার করে প্রতারণা শনাক্তের ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে।’

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতারণা চক্রের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক ধরনের পাল্টাপাল্টি লড়াই চলছে। একটি ঘাঁটি বন্ধ হলে অপরাধীরা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। এআই তাদের এ স্থান পরিবর্তন ও প্রতারণার কাজ আরো সহজ করে দিচ্ছে। তাই এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে শুধু একটি দেশের অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর


অনলাইন ব্যবসায় বাড়ছে এআই-নির্ভর প্রতারণার ঝুঁকি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ আগষ্ট ২০২৬ ২১:০৮ পিএম

এআই প্রযুক্তির অন্ধকার দিক ক্রমেই প্রাকাশ্যে আসতে শরু করেছে। এই প্রযুক্তি নির্ভর করে গড়ে উঠেছে প্রতারক চক্র। যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করে ব্যবসায় বিনিয়োগ, প্রেমের সম্পর্ক, চাকরি ও বিভিন্ন আর্থিক সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিনিধি ডেলফিন শানৎস বলেন, ‘এআই ব্যবহারের কারণে প্রতারণা চক্রগুলোর পরিচালন ব্যয় অনেকটা কমে গেছে। প্রতারকরা এআই দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করতে পারে। এমনকি ওই ব্যক্তির ভাষায় কথা বলাও সম্ভব হচ্ছে। এতে কম জনবল ব্যবহার করে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে।’

এআই অপরাধীদের ভুয়া ছবি, কণ্ঠস্বর ও পরিচয় তৈরির সুযোগ দিচ্ছে। ভিডিও কলে ব্যাংক বা পুলিশের কার্যালয়ের মতো কৃত্রিম পটভূমিও তৈরি করা যায়। বাস্তব মানুষের ছবি ও কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে ভুয়া ব্যক্তিও তৈরি করা সম্ভব। ফলে কোনো ভিডিও কল আসল নাকি কৃত্রিম তা অনেক সময় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অনলাইন প্রতারণায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ প্রতারণাসহ তিন ধরনের অনলাইন প্রতারণায় দেশটিতে বার্ষিক ক্ষতি ২০২১-২৫ সালের মধ্যে প্রায় চার গুণ বেড়ে ১ হাজার ৩০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

জাপানেও এ আর্থিক ক্ষতি পরিমাণ বেড়েছে। দেশটির জাতীয় পুলিশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনিয়োগ প্রতারণা, প্রেমের সম্পর্কের নামে প্রতারণা ও ফোনে প্রতারণার মতো ঘটনায় গত এক বছরে লোকসান প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইয়েনে (প্রায় ২০৬ কোটি ডলার)।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এরপর মার্কিন বিচার বিভাগ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় বড় ধরনের অভিযান চালায়। এতে ১৪ লাখের বেশি ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে অপরাধমূলক কার্যক্রম বন্ধ করা হয়।

কম্বোডিয়াও প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে বড় অভিযান চালিয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার বিদেশী নাগরিককে প্রতারণায় জড়িত থাকার সন্দেহে বহিষ্কার করেছে। জুনে রাজধানী নমপেনে পাঁচদিনের অভিযানে ১০১টি সন্দেহভাজন প্রতারণা কেন্দ্রে অভিযান চালানো হয়। এতে প্রায় দুই হাজার বিদেশীকে লক্ষ্য করা হয়। একটি বিলাসবহুল হোটেল থেকে ২৩ জন চীনা ও একজন মালয়েশীয় নাগরিককে আটক করা হয়। জব্দ করা হয় প্রায় ৭০০টি মুঠোফোন।

মিয়ানমারও চীনের অনুরোধে প্রতারণায় জড়িত সন্দেহে সাড়ে সাত হাজারের বেশি চীনা নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। তবে অভিযান জোরদার হলেও প্রতারণা চক্র পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। তারা ছোট ও কম পরিচিত জায়গায় ঘাঁটি সরিয়ে নিচ্ছে। আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট ও হোটেল কক্ষও ব্যবহার করছে। কেউ কেউ অন্য দেশেও চলে যাচ্ছে।

শ্রীলংকা এখন এমন একটি নতুন গন্তব্য হয়ে উঠেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) প্রতারণার সন্দেহে এক হাজারের বেশি বিদেশী নাগরিককে আটক করেছে। এ সংখ্যা ২০২৪ সালের পুরো বছরের আটকের সংখ্যার চেয়েও বেশি। চীনের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কিছু আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শ্রীলংকায় ঘাঁটি সরিয়েছে।

ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব তিমুরেও অভিযান চলছে। জুলাইয়ে পূর্ব তিমুরের রাজধানী দিলিতে এক জাপানি ও এক চীনা নাগরিককে আটক করা হয়। তারা একটি হোটেলকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে স্টারলিংক উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রতারণা চালাতেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। জুন ও জুলাইয়ের অভিযানে চীন, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩৫০ বিদেশীকে আটক করা হয়। প্রতারণা চক্র চুরি করা অর্থ দ্রুত বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। এতে অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা ও তা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

জাপান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান গবেষক ইয়োশিমাসা মরিগুচি বলেন, ‘এ অপরাধ ঠেকাতে বিভিন্ন দেশের সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি এআই ব্যবহার করে প্রতারণা শনাক্তের ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে।’

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতারণা চক্রের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক ধরনের পাল্টাপাল্টি লড়াই চলছে। একটি ঘাঁটি বন্ধ হলে অপরাধীরা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। এআই তাদের এ স্থান পরিবর্তন ও প্রতারণার কাজ আরো সহজ করে দিচ্ছে। তাই এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে শুধু একটি দেশের অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর